ভূমিকা পরাশক্তিগুলোকে লক্ষ করলে বোঝা যায়, তারা আসলে এটাই দেখাতে চাচ্ছে যে আমরা খুবই শক্তিশালী বা আধিপত্যবাদই আমাদের আসল পলিসি। এটার মাধ্যমেই আমরা অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কে উন্নীত হই। কিন্তু এগুলোই কি তাদের মূল উদ্দেশ্য? বাস্তব কথা হচ্ছে, বেশির ভাগ সময় আমরা যে জায়গাটিতে ভুল করে থাকি, বিশেষ করে আমরা যখন একটি রাষ্ট্রের পলিসি দেখতে যাই, আমরা ধরে নিই যে ওদের সামরিক বাহিনী অনেক শক্তিশালী আর এজন্যই তাদের আমরা শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করি। যেমন আমরা আমেরিকা, চীন, ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের শক্তিকে তাদের সামরিক সামর্থ্য দিয়ে বিচার করি এবং ভাবি এজন্য তারা প্রতাপশালী। কিন্তু বাস্তবতা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের সময়টায় বা ১৯৯০-এর পর থেকে বিশ্ব ব্যবস্থায় পুরো সময়টাই আসলে একটা ট্রানজিশনাল (বিবর্তনমূলক) প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটার ব্যাখ্যায় এখন না গিয়ে সংক্ষেপে বলতে চাই যে এ সময় পুরো বিশ্বব্যাপী আমরা দেখেছি যে এক ধরনের প্রক্সি যুদ্ধ চলেছে। যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, কিউবা সংকট।
যুক্তরাষ্ট্রের অবিসংবাদিত উত্থান
এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোয় বিভিন্ন সংকট। এগুলোকে যদি আমরা একদিকে রাখি আর নব্বইয়ের দশকে এই যে স্নায়ুযুদ্ধের ফলে সোভিয়েত পতন এবং পরবর্তীকালের উত্থান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি–এগুলো বিশ্বশক্তিগুলোর শক্তিমত্তা বিশ্লেষণে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময় বিশেষ করে নতুন যে সুপার পাওয়ার বা নতুন পরাশক্তিগুলোর উত্থান ঘটেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবিসংবাদিত উত্থান । আর এজন্য যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল? আসলে তখন তারা উল্লেখযোগ্যভাবে মনোযোগ দেয় তাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি সারা বিশ্বে সম্প্রসারণের পাশাপাশি আর কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করলে সারা বিশ্বে সম্পর্ক উন্নয়ন করে একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে।
কিভাবে সফট পাওয়ার আধিপত্য বিস্তার করবে
এ এর ফলে একজন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পণ্ডিত জোসেফ এস নাই জুনিয়র ছোট্ট একটা আর্টিকেল লিখলেন, মাত্র তিন পাতা। সেখানে তিনি প্রথমত পরামর্শ দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পলিসি কেমন হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দিলেন যে বর্তমানে যে হার্ড পাওয়ার বা সামরিক শক্তির ওপর দেশটি যে রকম প্রাধান্য দিচ্ছে সেটি তারা চালিয়ে যেতে পারে বা কমিয়েও আনতে পারে। কিন্তু পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি তত্ত্ব প্রথমবারের মতো উপস্থাপন করলেন, সেটি হলো ‘সফট পাওয়ার’-এর আইডিয়া। তার লেখায় তিনি মতবাদ দিলেন এ সফট পাওয়ারই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হতে পারে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। একজন আমেরিকান স্কলার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কনটেক্সটে সফট পাওয়ারের ব্যাখ্যায় তিনি বললেন যে কীভাবে দেশটি তাদের সংস্কৃতি দিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সংস্কৃতি দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারার বিষয়টি তিনি সামনে তুলে নিয়ে আনেন।
এজন্য তিনি কিছু সাংস্কৃতিক উপাদানকেও ব্যাখ্যা করলেন। যেমন হলিউডের সিনেমা, পপ মিউজিক, গান, স্পোর্টস, অলিম্পিক, খাদ্য, ব্র্যান্ড (যেমন স্টারবাকস, ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসি) প্রভৃতিকে ব্র্যান্ডিং লেভেলে নিয়ে এসে অন্য দেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করা। যাতে অন্য দেশের মানুষজন এগুলোর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে–এজন্য নয় যে আমেরিকান পণ্য বরং এ জিনিসগুলো তারা যেন এনজয় করে। যেমন আমার হলিউডের সিনেমা দেখতে খুব ভালো লাগে, তাই আমি এটার প্রতি আকর্ষণ বোধ করি। কোয়ালিটি মেইনটেন্যান্সের পুরো ব্যাপারটাই একটি পলিসিকে সামনে রেখে করা হয়েছে । এই যে রোডম্যাপ বা পলিসিগত সময়টা আমরা আজকে ২০২৪-এ দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপার নব্বইয়ের পর এটাকে সফট পাওয়ার নামক টার্মে আলোচনা করেছিলেন জোসেফ এস ন যেখানে চিন্তা বা পর্যালোচনা করছি, এটার কিন্তু এক ধরনের পর্যায়ক্রমিক স্তর ছিল। বিশেষত স্নায়ুযুদ্ধের সময় পুরো বিষয়টাকে দেখা হতো এক ধরনের প্রপাগাণ্ডা হিসেবে।
পাবলিক ডিপ্লোম্যাসির প্রসার এখানে একটা বিষয় যোগ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্নায়ুযুদ্ধের পুরো সময়টা ওয়েস্টার্ন দেখা হতো ডেমোক্রেটিক ব্লক হিসেবে। ওয়েস্টার্নরা সোভিয়েত ব্লকের যেকোনো সিনেমা সাংস্কৃতিক উপাদানকে প্রপাগান্ডা হিসেবে দেখত আর নিজেদের উন্নয়ন প্রচারণাকে তার দেখত পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি হিসেবে। তাদের ব্যাখ্যাটা এ রকম ছিল–পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি কেবল ওসব দেশই করতে পারবে যাদের দেশে ডেমোক্রেসি আছে। ডেমোক্রেসি গুরুত্বপূর্ণ? কারণ ডেমোক্রেসিতে মানুষের মতামতের গুরুত্ব থাকে; রাষ্ট্র কোনো একটা পলিসি গ্রহণ করার আগে মানুষের অংশগ্রহণের একটা প্রসেস থাকে যার মাধ্যমে রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত এবং সেই আলোকেই অন্য দেশের ওপর সে প্রভাব খাটাতে চেষ্টা করে। এজন্য তারা বলেছিল যে তাদের প্রভাব খাটানোটা একটা পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি, সেটা কোনো প্রপাগান্ডা নয়।
বৈচিত্র্য বিষয় সংযুক্তকরণ আর এটারই একটা মডার্ন ভার্সন যেটা ১৯৯০-এর পর ব্যাপক প্রচার পাওয়া একটা কাজ হলো সফট পাওয়ার। এর অর্থ হচ্ছে, আমরা শুধু পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি বা সরকারি পলিসিতেই সীমাবদ্ধ থাকব না, আমরা আরো পলিসি জেনারেট করব। এজন্য আমাদের সংস্কৃতির আরো উপাদান সংযুক্ত করা যেতে পারে। ইতিহাস হতে পারে, সভ্যতা হতে পারে, আমাদের ভাষা হতে পারে, যেমন ইংরেজি ভাষা এখন আমাদের সবার জন্য সর্বজনীন ও আন্তর্জাতিক ভাষা। কিন্তু এটা সর্বজনীন হওয়ার পেছনে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার প্রচুর বিনিয়োগ আছে। যেমন ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকান লার্নিং সেন্টার, ইএমকে সেন্টার। এগুলো এমনি এমনি আসেনি। এগুলোর পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আছে এসব দেশের। অন্যান্য দেশও এটা করে, কারণ তারা চায় যে এটার মাধ্যমে তারা সম্পর্ক। উন্নয়ন করবে। সব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্য দেশগুলোয় তাদের নিজস্ব লোকজন থাকবে, যারা তাদের নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, বৈশিষ্ট্য এমনকি দৈনন্দিন অভ্যস্ততার বিষয়গুলো যেমন তাদের ঘুম বা খাদ্য গ্রহণের নিয়ম-কানুন ওই দেশগুলোয় পৌছে দেবে। এভাবেই তারা পুরো প্রক্রিয়াটাকেই একটা সফট পাওয়ার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে।
সফট পাওয়ার হলো হার্ড পাওয়ার অর্জনের হাতিয়ার এভাবেই কিন্তু আমরা দেখেছি ১৯৯০, ১৯৯৪, ২০০০, ২০০৪ সালে এ পাওয়ার থিওরির আরো বিশদ ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। বিশেষ করে জোসেফ এস নাইয়ের একটি ব্যাখ্যা ছিল যে সফট পাওয়ার আসলে একটা বৃত্তের (সাইকেল) মতো। বৃত্তের মাঝখানে থাকতে পারে স্মার্ট পাওয়ার আর চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে হার্ড পাওয়ার। তিনিসহ আরো যারা এ বিষয়ে কাজ করেন তারা আরেকটি ব্যাখ্যা দিলেন যে সফট পাওয়ার আসলে পুরোপুরি একক কোনো বিশেষ শক্তিমত্তা নয়, আল্টিমেটলি হার্ড পাওয়ার অর্জন করাই এর উদ্দেশ্য। যেমন ধরা যাক, একটা দেশ আমার দেশের অস্ত্র কিনবে বা একটা দেশ আমার দেশ থেকে খুবই ব্যয়বহুল পণ কিনবে সেটার জন্য বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করা প্রয়োজন। সে যদি আমার ভাষা জানে, সংস্কৃতি জানে, আমি যে স্টাইলে কফি খাই সেটা জানে, আমি যে ব্র্যান্ডের জিনিস ব্যবহার করি সেটার সে অভ্যস্ত থাকে, আমার পছন্দের পোশাকাদি সম্পর্কে জানে অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ব্যবহার্য জিনিসের সম্পর্কটা যদি একটা বিস্তৃত পলিসির মধ্যে নিয়ে আসা যায় তাহলে সেটা সহজ হয়ে যায়।
পিস ডেমোক্রেসি
এখানে দুটি ব্যাপারে আমি কথা বলতে চাই। প্রথমত, সাংস্কৃতিক আকর্ষণ বা কালচারাল আকর্ষণের জায়গা থেকে বলছি। আরেকটি হলো যেটা জোসেফ এস নাইয়ের ব্যাখ্যা ছিল, পলিটিক্যাল ভ্যালুজ অর্থাৎ রাজনৈতিক মূল্যবোধ যেভাবে তিনি আমেরিকার জায়গা থেকে দেখেছেন। আমেরিকানদের রাজনৈতিক মূল্যবোধটা কী? ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্র। এ মূল্যবোধকেই তারা পৃথিবীব্যাপী দেখাতে চায়। আমরা হয়তো জানি মার্কিনদের অভ্যন্তরীণ অনেক সমস্যা আছে কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্পর্ক বা প্রতিপত্তি তৈরি করার ক্ষেত্রে তারা গণতন্ত্রকেই লক্ষণীয় করে দেখায়। সেখানে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য তারা এটাকে মাধ্যম হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে। অর্থাৎ অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে তখনই তারা সুসম্পর্কে যায় যখন ওই দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকে ।
এক্ষেত্রে আমি একটি উপাদানের কথা বলি, যেটি খুবই বিখ্যাত অর্থাৎ সম্পর্কগুলো বেশির ভাগ সময়ই উন্নত হয় সেটি হলো পিস ডেমোক্রেসি। তাদের কাছে এর অর্থ হচ্ছে, অন্য দেশ ও আমার দেশ দুটোতেই যদি গণতন্ত্র থাকে তাহলে সম্পর্কে শান্তি বজায় থাকে কিংবা দুটি দেশ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যুদ্ধে বা সংঘর্ষে জড়ায় না। এই যে পন্থাগুলো, বিভিন্নভাবে ফর্মুলা বা পলিসির উন্নয়ন ঘটিয়ে এর আসল উদ্দেশ্য হলো দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো। ফলে আরো যেন তারা নিজেদের মধ্যে পরিচিত হতে পারে। সুতরাং এ মূল্যবোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বৈদেশিক নীতি তৃতীয় বিষয় হলো ওদের বৈদেশিক নীতি। সেখানে আলোচ্য বিষয় হলো, নিজেদের কী সম্পদ আছে এবং মূল্যবোধ আছে। তারপরের কাজ হলো, এটার ওপর ভিত্তি করে বিদেশ নীতি বা পররাষ্ট্র নীতি তৈরি করা। জোসেফ এস নাই জুনিয়রের ব্যাখ্যা দাঁড় করালে আমরা যেটি পাই সেটি হলো, সব মিলিয়ে তিনটা জিনিসের মেলবন্ধনের মাধ্যমে তৈরীকৃত পররাষ্ট্র নীতিই পারে সফট পাওয়ার সৃষ্টি করতে।
ক্রস-কালচারাল উপাদান বর্তমান সময়ে আমরা দেখছি যে অনেক সংজ্ঞা বা তত্ত্বের নতুন নতুন ব্যাখ্যা আলোচিত হচ্ছে। এখন টেকনোলজি, ডিজিটালাইজেশন, এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) আলোচনায় থাকছে। এছাড়া ক্রস-কালচারাল উপাদানগুলো আদান-প্রদানে দেশগুলোর বহুমাত্রিক সম্পর্ক প্রতিফলিত হচ্ছে। এছাড়া ট্যুরিজম, অফিশিয়াল বা রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বাইরেও একক কোনো ব্যক্তি অন্য দেশে গিয়ে প্রভাব তৈরি করতে পারে। যেমন কোনো নোবেল বিজয়ী ব্যক্তি যেমন ড. মুহাম্মদ ইউনূস বা বিখ্যাত কোনো সাহিত্যিক যেমন পাওলো কোয়েলহোর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা সফট পাওয়ার হিসেবে অন্য দেশে প্রভাব বিস্তার করতে পারে বা নিজ দেশের স্বার্থ তুলে ধরতে পারেন ।
সম্পদকে পলিসিতে রূপান্তরের অভাব যেকোনো দেশের পররাষ্ট্র নীতির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করা। সুতরাং সব ধরনের পন্থা বা উপায়কেই একটি নির্দিষ্ট পলিসির অধীনে নিয়ে কূটনৈতিক কৌশল বানানো। আসলে সব দেশেরই সফট পাওয়ার আছে কিন্তু মূল সমস্যার জায়গা হচ্ছে, অধিকাংশ দেশ জানেই না যে এটির জন্য ঠিক কী ধরনের পলিসি নেয়া উচিত। তাদের সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের জ্ঞান কম। ফলে সম্পদকে কীভাবে পলিসিতে রূপান্তর করতে হয় এবং সেটার সুবিধা আদায় করতে হয়–এ জায়গাটিতে ওই সব দেশের বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব কারণে বিশ্বের অনেক দেশ তাদের সম্পদ ও অন্যান্য সুবিধাজনক উপাদানকে কাজে লাগাতে পারছে না। যেমন আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানায় প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ ট্যুরিস্ট যায়। কারণ দেশটি প্রাকৃতিকভাবে যেমন সুন্দর ও সমৃদ্ধ, তাদের খাবার, সংস্কৃতি বৈচিত্র্যপূর্ণ। কিন্তু তার পরও তারা কেন সফট পাওয়ার হতে পারেনি কারণ তারা এ ধরনের পলিসি নিতে পারেনি। একই কথা আমাদের দেশের জন্যও প্রযোজ্য।
কয়েকটি দেশ সফট পাওয়ারে গুরুত্ব দিচ্ছে এভাবে বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি শক্তিধর রাষ্ট্র ও উদীয়মান শক্তিশালী রা পাওয়ারে প্রচুর গুরুত্ব দিচ্ছে ও বিনিয়োগ করছে। উদীয়মান শক্তিগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, তুরস্কের উদাহরণ প্রণিধানযোগ্য। এসব দেশকে এখন বিশ্ব রাজনীতির উদীয়মান বা মাঝারি শক্তির দেশ বলা হয়। উদীয়মান বা মাঝারি শক্তিশালী দেশ বলার পরিমাপক এমন নয় যে দেশগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে জয়লাভ করে ফেলেছে বা কোনো নেতৃত্ব দিয়েছে বা কোনো বিশেষ শক্তিশালী অস্ত্রের মালিকানা রয়েছে বলে। ধরে। বিশেষ করে নাগার্নো কারাবাখ থেকে ইউক্রেন, সিরিয়া থেকে লিবিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র এক্ষেত্রে তুরস্কের ‘বায়রাক্তার’-এর প্রসঙ্গটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়ে আসছে দীর্ঘ ব্যবহার, এমনকি সম্প্রতি ইরানের নিহত প্রেসিডেন্ট রাইসির বিধ্বস্ত বিমান খুঁজে দেয়ার জন্যও এটির বিশেষ অবদান রয়েছে। এটি একটি যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং এর উদ্দেশ্য হলে যুদ্ধক্ষেত্রে মিলিটারিকে সহায়তা করা। কিন্তু একাডেমিয়ার আলোচনা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক নানা ব্যাখ্যায় এটি কিন্তু শুধু যুদ্ধ সরঞ্জামই নয় বরং এটি একটি শক্তিশালী সফট পাওয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থাৎ একটি দেশ যদি যুদ্ধ সরঞ্জাম ব যুদ্ধাস্ত্রের ওপর পলিসি ঠিকঠাকভাবে বানাতে পারে তাহলে সেটিও কিন্তু সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করে। সুতরাং এটি একটি দেশের পলিসির ওপর নির্ভর করে যে সে কীভাবে আসলে বিশ্বের কাছে তার সম্পদগুলো দেখাবে। এমনকি মিলিটারিকেও সফট পাওয়ারের কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, যেমন আমাদের দেশেই সামরিক বাহিনী জাতিসংঘের পিস মিশনে প্রচুর পরিমাণে অংশগ্রহণ করে থাকে। কিন্তু বিষয়টিকে আমরা আসলে কতটুকু সফট পাওয়ার হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছি সেটা হলো আলোচনার বিষয়। আমাদের মিলিটারিরা বিশ্বের শান্তিরক্ষায় বিশাল ভূমিকা পালন করছে। এটাকে আমরা সফট পাওয়ারের উপাদান হিসেবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারলে সেটা কিন্তু সুফল বয়ে নিয়ে আসবে। এর আউটকাম আসতে পারে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে। এমনকি আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি কাজে লাগাতে পারি। ১৮ অক্টোবর ২০২৪। ড. মো. নাজমুল ইসলাম: সহযোগী অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাডিজের প্রধান, আঙ্কারা ইলদিমির বেয়েজিদ ইউনিভার্সিটি, তুরস্ক। সূত্র: বণিকবার্তা ।