ভূমিকা ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যাত্রার শুরুতে বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর মধ্যে ছিল অন্যতম। তখন অনেকেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করতেন। উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশকে একটি অনুন্নত রাষ্ট্র হিসেবে ভাবতেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি কবে, কিভাবে ঘটবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারতেন না। দেশে অপেক্ষাকৃত যারা সচ্ছল ছিলেন, তাদের অনেকেই তখন সুখের সন্ধানে উন্নত দুনিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মধ্যে তেমন কোনো আশাবাদ ছিল না। কারণ, বেশিরভাগ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করত। আমাদের মাথাপিছু আয় তখন ১০০ ডলারের নিচে ছিল । ঠিক ঐ সময় এ দেশটির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কথা ভাবাটা ছিল এক ধরনের স্বপ্ন।
বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক: তথ্য বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণ এসেছে ৯২ দশমিক ৩৬৭ বিলিয়ন ডলার। এ সময় বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের অনুদান পেয়েছে ৩০ দশমিক ১০৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মোট উন্নয়ন সহযোগিতা পেয়েছে ১২২ দশমিক ৪৭২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে খাদ্য সহায়তা বাবদ এসেছে ৭ দশমিক ০৩১ বিলিয়ন ডলার, পণ্য সহায়তা বাবদ এসেছে ১০ দশমিক ৯০৮ বিলিয়ন ডলার এবং প্রকল্প সহায়তা বাবদ এসেছে ১০৪ দশমিক ৫৩৩ বিলিয়ন ডলার । একক সংস্থা হিসেবে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে। যার পরিমাণ ২৮ দশমিক ৪৪৬ বিলিয়ন ডলার। মোট উন্নয়ন সহযোগিতার ২৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। সংস্থাটির এ সহায়তার আওতায় অনুদান দিয়েছে ১ দশমিক ৬২৩ বিলিয়ন ডলার । বাকি ২৬ দশমিক ৮২৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ।
এডিবি: তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশকে ২২ দশমিক ৪২৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা করেছে। উন্নয়ন সহযোগিতার তা ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। সংস্থাটি বাংলাদেশকে অনুদান দিয়েছে মাত্র ৩৮২ মিলিয়ন ডলার। বাকি ২২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারই দিয়েছে ঋণ হিসেবে। যদিও এই দুই সংস্থা কখনই বাংলাদেশকে খাদ্য সহায়তা দেয়নি। তবে পণ্য সহায়তার আওতায় কিছু ঋণ দিয়েছে সংস্থা দুটি।
জাপান সরকার: জাপান সরকার বাংলাদেশকে সহায়তায় রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। ৫৩ বছরে দেশটি ২০ দশমিক ৪৫২ বিলিয়ন ডলার বা ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ সহায়তা দিয়েছে। মোট সহায়তার মধ্যে জাপান ৩ দশমিক ৬০৯ বিলিয়ন ডলার অনুদান ও ১৬ দশমিক ৮৪৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে দিয়েছে। চীন: চতুর্থ অবস্থানে থাকা চীন বাংলাদেশকে ৮ দশমিক ১১৫ বিলিয়ন ডলার বা ছয় দশমিক ৬৩ শতাংশ সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১০৪ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে দেশটি।
রাশিয়া: উন্নয়ন সহযোগীর তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে থাকা রাশিয়া বাংলাদেশকে ৬ দশমিক ৮৭৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে, যা মোট সহায়তার পাঁচ দশমিক ৬১ শতাংশ। দেশটির সহায়তার মধ্যে মাত্র ৩৫ মিলিয়ন ডলার ছিল অনুদান ।
জাতিসংঘ ও তার অঙ্গসংগঠন: উন্নয়ন সহযোগীর তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা জাতিসংঘ ও তার অঙ্গসংগঠন পুরো অর্থই বাংলাদেশকে অনুদান হিসেবে দিয়েছে। এ সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৯৫ বিলিয়ন ডলার বা তিন দশমিক ৯২ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্র ৩ দশমিক ৮৫৬ বিলিয়ন ডলার বা তিন দশমিক ১৫ শতাংশ সহায়তা দিয়ে রয়েছে সপ্তম স্থানে।
যুক্তরাজ্য: পরের স্থানে থাকা যুক্তরাজ্যের সহায়তার পরিমাণ ২ দশমিক ৭২৭ বিলিয়ন ডলার বা দুই দশমিক ২৩ শতাংশ ।
জার্মানি ও কানাডা: উন্নয়ন সহযোগিতায় যথাক্রমে নবম ও দশম স্থানে থাকা জার্মানি বাংলাদেশকে ২ দশমিক ২৫১ বিলিয়ন ডলার বা এক দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং কানাডা দিয়েছে ২ দশমিক ২১৪ বিলিয়ন ডলার বা এক দশমিক ৮১ শতাংশ ।
অন্যান্য দেশ ও সংস্থা এছাড়াও ভারত বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে সর্বোচ্চ সহায়তার পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগিতা দিয়েছে ২ দশমিক ১৪৩ বিলিয়ন ডলার বা এক দশমিক ৭৫ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সহযোগিতা দিয়েছে ২ দশমিক ১০৫ বিলিয়ন ডলার বা এক দশমিক ৭২ শতাংশ। অন্যান্য সংস্থা ও দেশের সহযোগিতার পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলারের কম। এর মধ্যে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যাংক (এআই আহ ইউনিসেফ, ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি), নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ডেনমার্ক এবং শেয় আরবের উন্নয়ন সহযোগিতার পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। বাকিদের সহায়তা তার চেয়েও কম।
বাংলাদেশের খাদ্য সহায়তা স্বাধীনতার পরের বছরগুলোয় খাদ্য সহায়তা আসত বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে এ সহায়তা করে ইআরডির তথ্য বলছে, বাংলাদেশকে বিভিন্ন সময় খাদ্য সহায়তা দিয়েছে বিভিন্ন দেশ। মূলত এসেছে। খাদ্য সহায়তার মধ্যে অনুদান হিসেবেই এসেছে ৮৯ শতাংশের বেশি অর্থ, যার পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ২৬৮ বিলিয়ন ডলার। বাকি ৭৬৩ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১১ শতাংশ ছিল ঋণ সহায়তা। খাদ্য সহায়তা বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি দিয়েছে জাতিসংঘ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন, যার পরিমাণ ২ দশমিক ১৪৩ বিলিয়ন ডলার। খাদ্য সহায়তায় এর পরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি ইউএসএইডের আওতায় বাংলাদেশকে বিভিন্ন সময়ে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে, যার পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৮০৪ বিলিয়ন ডলার। পণ্য সহায়তার আওতায় প্রায় ৫২ শতাংশ বা ৫ দশমিক ৬৫১ বিলিয়ন ডলার এসেছে অনুদান এবং ৪৮ শতাংশ বা ৫ দশমিক ২৫৭ বিলিয়ন ডলার ছিল ঋণ। পণ্য সহায়তা সবচেয়ে বেশি দিয়েছে জাপান এবং বিশ্বব্যাংক। আর প্রকল্প সহায়তার মধ্যে ১৮ দশমিক ১৮৬ বিলিয়ন ডলার বা ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে অনুদান হিসেবে। বাকি ৮৬ দশমিক ৩৪৭ বিলিয়ন ডলার বা ৮২ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল ঋণ সহায়তা। ঋণের ক্ষেত্রে শীর্ষ তিন অবস্থানে রয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাপান।
উপসংহার সুতরাং, ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়া দারিদ্র্যপীড়িত এবং অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর বাংলাদেশ থেকে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের দীর্ঘ এই পথচলায় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশ ও সংস্থার ভূমিকা স্মরণীয়। উন্নয়ন সহযোগী সকল দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বলেই উন্নয়ন ট্র্যাক থেকে বাংলাদেশ কখনো পিছলে যায়নি এবং ভবিষ্যতেও যাবে না। কারণ, শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী সে সব দেশ ও সংস্থার সঙ্গে বরাবরের মতো সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সদা সচেষ্ট। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই বিদেশনীতির ওপর ভর করেই বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী বিদেশী বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন। এতে বজায় থাকবে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পূর্ণ গতিশীলতা এবং দ্রুত পূর্ণতা পাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা। ৬ জুন ২০২৪। ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া লেখক : অধ্যাপক, উপাচার্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র: জনকণ্ঠ।