ভূমিকা জাতিসংঘ ঘোষিত সিডও (Convention on the Elimination of all forms of Discrimination Against Women (CEDAW) – নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ দলিল । একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে নারীর সব অধিকার প্রতিষ্ঠার দলিল সিডও। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই সনদ ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর গৃহীত হয়। এটা কার্যকর হতে শুরু করেছে ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে। আবহমান কাল ধরে চলে আসা নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক–সব ক্ষেত্রে ধর্মের নামে, নানা প্রথার নামে যে বৈষম্য চলে আসছে তা দূর করে নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘ এ সনদ প্রণয়ন করেছে।
সিডও সনদ কী
৯টি আন্তর্জাতিক সনদের মধ্যে অন্যতম, সিডও সনদ, যাকে বলা হয় Women’s Bill of Rights. শিশু অধিকার সনদের পর এটি সর্বাধিক দেশে অনুমোদনপ্রাপ্ত সনদ। এ পর্যন্ত ১৮০টির বেশি দেশ সিডও সনদ অনুমোদন ও গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬০টির বেশি দেশ সনদের ধারাগুলো তাদের দেশের সংবিধান কিংবা প্রচলিত আইনে যুক্ত করে নিয়েছে। প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, জাতিসংঘ সিডও সনদে অনুমোদনকারী দেশগুলো শুধু নারী-পুরুষের স্বীকৃতি প্রদান করেনি, সেই সঙ্গে তা বাস্তবায়নেরও স্বীকৃতি আদায় করেছে। এর অর্থ যেকোনো দেশ কর্তৃক এ বিল অনুমোদনের মাধ্যমে তা সেই দেশের সংবিধান, আইন ও নীতিমালায় প্রতিফলিত হতে হবে।
সিডও সনদের বিষয়গুলো হলো :
১. মানবসমাজ সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়নে যুগ যুগ ধরে নারীসমাজ যে অবদান রেখে আসছে তার স্বীকৃতি
২. বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক
৩. নারীর উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়ন।
৪. প্রচলিত বৈষম্যমূলক আইনের (নারীর স্বার্থ পরিপন্থী) সংস্তার এবং তা প্রয়োগের উপ পরিবেশ তৈরি করে নারীবান্ধব প্রশাসন তৈরি বা ভিত্তি স্থাপন ।
৫. নারীর অধিকার মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান ।
৬. এই মূলকথাগুলো ধারণ করে তিনটি মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত সিডও সনদ-সদর। নীতি, বৈষম্য নীতি এবং রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বের নীতি ।
৭. সিডও সনদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এই সনদটিকে জাতিসংঘ কর্তৃক মানবাধিকারবিষয়ক অন্যান্য সনদ থেকে ভিন্নতা দিয়েছে। যেমন…
ক. সিডও সনদ নারীর মানবাধিকার সংক্রান্ত একমাত্র আন্তর্জাতিক সনদ ।
খ. নারীর প্রতি বৈষম্যের সংজ্ঞা সিডও সনদে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
গ. সিডও সনদ প্রথম জনজীবন (public) এবং ব্যক্তিগত জীবন (Private)–এই উচ্চ ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য অপনোদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ঘ. সিডও সনদ রাষ্ট্রের ওপর বাস্তবায়নে আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে।
ঙ. রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন–সব ক্ষেত্রে এবং বৈশ্বিক অবস্থানির্বিশেষে নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রকৃত সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা এই সনদে উল্লেখ করা হয়েছে ।
চ. নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রকৃত সমতা স্থাপনের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সিডও।
ছ. সিডও সনদ সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনে নারীর ভূমিকা এবং অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে এবং নারীর প্রজনন ভূমিকাকে সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ঝ. সিডও সনদে ক্রমাগত নারীর অবস্থা সদস্য রাষ্ট্রগুলোয় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে সিডও সনদ অনুমোদনের এক বছরের মধ্যে এবং পরবর্তী চার বছর অন্তর সিডও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রতিটি দেশের জাতীয় রিপোর্ট জাতিসংঘের সিডও কমিটিতে পেশ করতে হয়। সিডও কমিটির বিশদভাবে পর্যালোচনা করে এবং এর ওপর বিভিন্ন মন্তব্য ও সুপারিশ রিপোর্ট প্রদানকারী রাষ্ট্রকে অবহিত করে। এখানে জাতিসংঘ সিডও কমিটিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর বিকল্প রিপোর্ট পেশ করার এবং অংশগ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার রিপোর্টগুলোর মধ্যে সিডও কমিটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে এবং সরকারের পক্ষ থেকে নারীর পক্ষে ভূমিকা পালন সম্পর্কে ধারণা নিয়ে সে অনুযায়ী রিপোর্ট প্রদানকারী দেশের প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। সিডও সনদে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালে স্বাক্ষর করার পর থেকে প্রতি চার বছর অন্তর সরকার ও বেসরকারি রিপোর্ট সিডও কমিটিতে উপস্থাপন করা হচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর করোনা সংকটের জন্য কিছুটা পিছিয়ে ২০২৩ সালে রিপোর্ট জমাদানের প্রক্রিয়া চলছে।
অপশনাল প্রটোকল : নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ
১৯৯৯ সালের ৬ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় ২১টি ধারাসংবলিত সিডওর ন্যাশনাল প্রটোকল। ২০০০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশসহ আরো অনেক দেশ তা স্বাক্ষরের জন্য অনুমোদন করে। নিজ দেশে কোনো নির্যাতিত নারী বিচার লাভে ব্যর্থ হলে প্রতিবিধানস্বরূপ প্রটোকলের আওতায় সরাসরি জাতিসংঘে অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে অপশনাল। অভিযোগ প্রাপ্তির পর সিডো কমিটির নিজস্ব উৎসর মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে এবং সংশ্লিষ্ট দেশে নতুন করে ওই ঘটনা তদন্তের জন্য সিডো কমিটির গাইডলাইন অনুযায়ী রিপোর্ট সংগ্রহ করে ।
সিডর অপশনাল প্রটোকলে মূলত দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে—
১. যোগাযোগ অথবা আবেদন করার প্রক্রিয়া ।
২. তদন্ত করার প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অপশনাল প্রটোকলের দুটি ধারায় সংরক্ষণ আরোপ করে অপশনাল প্রটোকলে স্বাক্ষর করেছে। নারীর মানবাধিকার সংরক্ষণের অপশনাল প্রটোকল একটি কার্যকর প্রক্রিয়া হিসেবে জাতিসংঘের যেসব সদস্য রাষ্ট্র প্রটোকল স্বাক্ষর করেছে, সেসব রাষ্ট্রের ওপর দায়বদ্ধতার চাপ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ।
মোট ৩০টি ধারা সম্বল করে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি ধারা কর্মসূচি সংক্রান্ত, বাকি ১৪টি ধারা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় সম্পর্কিত।
ধারার সংরক্ষণ আরোপ বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালে এই বৈশ্বিক দলিলটিতে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সনদের গুরুত্বপূর্ণ শরিক রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বের নীতি স্বাক্ষর করার সময় বাংলাদেশ সরকার এই সনদের চারটি ধারায় সংরক্ষণ আরোপ করে। চলমান নারী আন্দোলন ও মানবাধিকার আন্দোলনের দাবির ফলে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে ১৩(ক) এবং ১৬-এর (চ) ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করলেও heart of convention বলে অভিহিত ২ নম্বর ধারা এবং আরেকটি ধারা ১৬-এর (গ) থেকে এখনো সংরক্ষণ প্রত্যাহার করেনি। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে এই ধারাগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাজেই সিডও সনদের দুটি ধারার ওপর সংরক্ষণ বহাল থাকার বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধানের মর্ম কথার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
সনদের ২ নম্বর ধারা সিডও সনদের ২ নম্বর ধারায় নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক রীতি-নীতি, প্রথা, আচার-ব্যবহার নিষিদ্ধ করে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার নীতিমালার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সব ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা, আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে নারীকে বৈষম্য থেকে রক্ষা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নারীর প্রতি বৈষম্যপূর্ণ ব্যবহার রোধ করার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে ১৬- এর (গ) ধারায় বিয়ে, বিয়ের পছন্দ-অপছন্দের বিষয় এবং বিবাহবিচ্ছেদকালে নারী- পুরুষের সমঅধিকারের ও দায়দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
সংবিধানের সাথে সাংঘার্ষিক ২০০৪ সালে বাংলাদেশের তিনটি নারী সংগঠন রিপোর্ট তৈরি করে সিডও কমিটির কাছে উপস্থাপন করে তাতে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার অভাব ও দায়িত্বহীনতার কথা বলা হয়েছে। সিডও কমিটি উপস্থিত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, দেশের প্রচলিত আইন সংস্কার করে সিডওর আলোকে আইন প্রণয়ন ও ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড চালুর ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানায়। এ ছাড়া সব পর্যায়ে নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই অঙ্গীকারকে বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশ সরকারের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বাংলাদেশের শাসন বর্ণিত মৌলিক অধিকার ও সমান অধিকার আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘ ঘোি ফ্যামিলি কোড বা অভিন্ন পারিবারিক আইনের প্রস্তাবনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণ করে দে মানবাধিকার সনদগুলোর ধারা, বিশেষত সিডও সনদের ধারার সঙ্গে সংগতি রেখে ইউনি যায়, সিডওর মূল মর্মবাণীর সঙ্গে অভিন্ন পারিবারিক আইনের ধারাগুলো এক ও বিচারপতি কে এম সোবহান ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোডের যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলেছেন নারীপুরুষ-নির্বিশেষে সবার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য। বাংলাদেশের প্রতিটি ধর্মের লোকের “বাংলাদেশে সব নাগরিকের জন্য আইন আছে, আদালত আছে, যা ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী বিয়ে সংক্রান্ত। অর্থাৎ বিয়ে এবং বিয়েবিচ্ছেদ এবং উত্তরাধিকার সম্পর্কিত আইন আছে, বা জন্য ধর্মভিত্তিক ‘পারসোনাল ল’ প্রচলিত আছে। এই ‘পারসোনাল ল’ ধর্মের ভিত্তিতে ব্যক্তির নাগরিকদের মধ্যে বিভাজনের সৃষ্টি করেছে, যা অসাংবিধানিক এবং মৌলিক অধিকারবিরোধী।
অভিন্ন পারিবারিক আইন অভিন্ন পারিবারিক আইনের বিষয়গুলো হলো :
১. অভিন্ন বিয়ে ও রেজিস্ট্রেশন আইন,
২. অভিন্ন ভরণ-পোষণ আইন,
৩. অভিন্ন অভিভাবকত্ব ও আইন,
৪. অভিন্ন দত্তক ও পোষ্য সন্তান আইন,
৫. অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন।
নারীর প্রতি আবহমানকাল থেকে চলে আসা বৈষম্য, অবিচার, নির্যাতন দূর করে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। সংবিধানে স্বীকৃত নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সিডওর বিধানগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে প্রণয়ন করা হয়েছে অভিন্ন পারিবারিক আইন। সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার এবং বাংলাদেশে নারীর সম-অধিকার আইনগত ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে নারীর প্রতি বিরাজমান সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের দলিল বাস্তবায়নের জন্য মহিলা পরিষদও ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড বা অভিন্ন পারিবারিক আইন দেশের সব শ্রেণি-পেশার-ধর্মের নারীদের জন্য তথা দেশের সব নাগরিকের জন্য একটি সমতাভিত্তিক সর্বজনীন পারিবারিক আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে।
সনদের ১৬ নম্বর ধারা সিডও সনদের ১৬ নম্বর ধারায় বিয়েসহ সব ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে নারী- -পুরুষের সম-অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে সম্পত্তির মালিকানা, ব্যবস্থাপনা, ভোগ ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়। মানুষের জীবনে যে মৌলিক বিষয়গুলো অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করে, সেসব বিষয় সম্পৃক্ত সমস্যা সমাধান না হলে যে অসমতার মূলে আঘাত করা যায় না–এই মূল কথাটি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিকে উপলব্ধি করতে হবে। অভিন্ন পারিবারিক আইনের খসড়া প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের আপত্তি দেয়া দুটি ধারা ধারা-২: বৈষম্য বিলোপ করে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপনের নীতিমালা গ্রহণ । প্রতিটি দেশের জাতীয় সংবিধান, আইন-কানুন ও নীতিমালায় নারী ও পুরুষের সমতার নীতিমালা সংযুক্তকরণ ও তার প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন-কানুন, রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। সব ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ । আদালত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নারীকে সব ধরনের বৈষম্য থেকে রক্ষা করা। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নারীর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন রোধ করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া। ধারা-১৬.১(গ): বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদকালে নারী ও পুরুষের একই অধিকার ও দায়দায়িত্ব নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের অষ্টম সাময়িক প্রতিবেদনের ওপর সিডও কমিটির সুপারিশ (২০১৬) সুপারিশকৃত সমাপনী অভিমত—
সংরক্ষণ: কমিটি এ মর্মে অসন্তোষ ব্যক্ত করছে যে পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সরকার এখন পর্যন্ত সিডও সনদের ২ ও ১৬.১(গ) ধারার ওপর থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করেনি। সরকারের এ অবস্থান সিডওর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় ।
আইনগত কাঠামো: কমিটি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছে যে দেশে এখনো বৈষম্যমূলক আইন ও বিধি রয়ে গেছে। যেমন বিভিন্ন আইনে ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশুর সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বয়সের উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধের আওতায় বিবেচনা করা যাচ্ছে না, নারী নির্যাতনবিরোধী বিশেষ ট্রাইবুন্যালে নারীর প্রতি বৈষম্যসংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার করা সম্ভব হচ্ছে না।
নারীর উন্নয়নে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো: কমিটি উল্লেখ করে যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় নারীর অধিকার বাস্তবায়নে ও সরকারের সব বিভাগে জেন্ডার মূলধারাকরণের কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। যদিও কমিটি হতাশার সঙ্গে লক্ষ করছে কার্যকরভাবে নারীর অধিকার ও জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায় মন্ত্রণালয়টির অস্পষ্ট কাজের এখতিয়ার, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় জনবল, কারিগরি ও আর্থিক সম্পদের অভাব রয়েছে।
প্রচলিত ধারণা এবং ক্ষতিকর চর্চাগুলো পুরুষের পাশাপাশি নারীর পূর্ণ মানবাধিকার উপভোগ ও জীবনের সব ক্ষেত্রে তাদের সমানাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক যাবতীয় গত্বাঁধা বৈষম্যমূলক ধারণাগুলোকে নির্মূল করার ব্যাপারে রাষ্ট্রের যথেষ্ট প্রচেষ্টা না থাকায় কমিটি তার হতাশা ব্যক্ত করে । জেন্ডারভিত্তিক নারী নির্যাতন: কমিটি উদ্বিগ্ন যে বাংলাদেশে নারী ও মেয়ে শিশুর বিরুদ্ধে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা যার মধ্যে ধর্ষণ, ফতোয়া ও যৌতুকের কারণে নির্যাতন, পরিবারে ও জনজীবনে যৌন হয়রানির মতো ঘটনা এখনো বন্ধ হয়নি। জেন্ডারভিত্তিক নির্যাতনের মাত্রা বোঝার জন্য জরিপ/গবেষণা এবং জেন্ডার বিভাজিত তথ্য-উপাত্ত নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে না।
পাচার এবং পতিতাবৃত্তির মাধ্যমে শোষণ: কমিটি দেশের নারী ও মেয়েশিশু পাচারের অব্যাহত ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ নারী পাচারের একটি ট্রানজিট বা পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এবং এর কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু কমিটি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছে যে ২০১২ সালের পর থেকে কতজন পাচারকারীর বিচার ও সাজা হয়েছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই।
রাজনৈতিক ও জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ: জাতীয় সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসনসংখ্যা ৫০তে উন্নীত করার উদ্যোগকে কমিটি স্বাগত জানায়। তবে কমিটি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছে যে কেবল অল্পকিছু নারী রাজনৈতিক ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ে যেতে পারছে; কিন্তু সাধারণভাবে সংসদে, বিচার বিভাগে, প্রশাসনে এবং ব্যক্তি খাতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো কম ।
২০১৬ সালের অক্টোবরে প্রণীত বৈদেশিক সাহায্য: আইন অনুযায়ী সরকার ইচ্ছা করলেই নারী সংগঠনসহ সুশীল সমাজের সংস্থাগুলোর ওপর বিশেষ করে তাদের অর্থায়নের ব্যাপারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে যা এনজিওদের বিনামূল্যে নিবন্ধন এবং কর্মসূচি পরিচালনায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কমিটি উদ্বেগের সঙ্গে এটাও লক্ষ করছে যে সরকারের সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা বেসরকারি সংস্থাসহ যেসব সংস্থা মানবাধিকার ও নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করে তাদের কর্মকাণ্ডকে আরো সীমিত করে ফেলতে পারে।
জাতীয়তা: কমিটি সরকারকে নাগরিকত্ব আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের সুপারিশ করছে যাতে বাংলাদেশী মাতা-পিতার ঔরসে জন্ম নেয়া সব শিশু বাংলাদেশী নাগরিকত্ব লাভ করতে পারে। কমিটি আরো সুপারিশ করছে যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জন্ম নেয়া সব শিশুর জন্মের পর পরই নিবন্ধন করা হয়।
শিক্ষা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা হওয়ায় কমিটি সরকারকে সাধু জানায় । তবে কমিটি কিছু বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
কর্মসংস্থান: কমিটি সরকারের শ্রম আইন ও নীতি ২০১৩ প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এতে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করা হয়েছে। কিন্তু কমিটি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছে আইনটি অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ২০১৩ সালের পর থেকে রেজিস্ট্রেশনের বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার ক্ষেত্রে আইনগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, বিশেষ ক নারীনির্ভর শিল্প-কারখানা ও কৃষিতে ।
গৃহশ্রমিক নারী: কমিটি সুপারিশ করছে যে গৃহশ্রমিকদের কাজের পরিবেশ যাচাইয়ে ফ্যাক্টরিতে নিয়মিত পরিবীক্ষণ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের নির্যাতনের ঘটনা তদন্ত করতে হবে। গৃহশ্রমিকদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে তাদের বিনামূলে আইনি সহযোগিতা প্রদান করতে হবে ।
স্বাস্থ্য: অল্প বয়সে বিয়ে ও মা হওয়ার কারণে দেশে মাতৃমৃত্যুর উচ্চহার এবং গর্ভপাতরে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করায় কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করে ।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন : গ্রামীণ নারীদের অপ্রতুল ঋণ, সরকারি ব্যাংকের লোন সুবিধ না থাকা এবং নারী কৃষকদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়ায় কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করে।
গ্রামীণ নারী: কমিটি সুপারিশ করছে যাতে সরকার গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নে সিদ্ধান্ত গ্রহ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক পরিষেবা, ভূমির মালিকানা ও উত্তরাধিকারীর এবং বিশুদ্ধ খাবার পানি ব্যবহারের সুযোগ নিচিত করতে পদক্ষেপ নেবে।
সুবিধাবঞ্চিত নারী: কমিটি সরকারের প্রতি সুপারিশ করছে যে বিশেষ দুর্বল জনগোষ্ঠীর মেয়েশিশুসহ নারী ও মেয়েশিশুদের প্রতি সব ধরনের বৈষম্য, জেন্ডারভিত্তিক নির্যাতন। সাময়িক বিশেষ ব্যবস্থাসহ সর্বাত্মক আইন প্রণয়ন এবং আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিয়ে ও পারিবারিক সম্পর্ক: কমিটি সুপারিশ করেছে য সরকার বর্তমানে প্রচলিত আইনগুলোর পর্যালোচনা করবে এবং একটি সর্বজনীন পারিবারিক আইন চালু করবে যা সব ধর্ম ও বিশ্বাসের লোকদের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে। এতে বিয়ে এবং তালাকের সময় সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করবে।
তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ: সিডও সনদের সব বিষয়ের ওপর তথ্যের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে সে ব্যাপারে কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
বেইজিং ঘোষণা ও প্ল্যাটফরম ফর অ্যাকশন: কমিটি পরামর্শ দিচ্ছে যাতে সিডও সনদের ধারাগুলোর বাস্তবায়নে সরকার বেইজিং ঘোষণা বা প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে।
টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা ২০৩০: কমিটি সরকারকে এ মর্মে আহ্বান জানাচ্ছে যেন সরকার টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সিডও সনদের ধারা অনুযায়ী সর্বাত্মক জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করে।
প্রচার: সিডও সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কমিটি রাষ্ট্রপক্ষকে অনুরোধ জানাচ্ছে যেন বর্তমান সমাপনী অভিমতগুলো দেশের রাষ্ট্রভাষায় সব পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে সরকার, মন্ত্রণালয় এবং বিচার বিভাগের কাছে তুলে ধরে। শেষের কথায় বাংলাদেশ সরকার সিডওর অষ্টম সাময়িক প্রতিবেদন জমা দেয়ায় কমিটি সন্তোষ প্রকাশ করে।
উপসংহার ঃ জাতিসংঘ ঘোষিত সিডওর ধারাগুলো যেমন নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য, তেমনি ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোডের মর্মবাণী নারী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য। ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২। সারাবান তহুরা লেখক : প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সূত্রঃ কালেরকণ্ঠ।