বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে আমরা জানি, সরকারি-বেসরকারি যেকোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দুটি মোটিভ থাকে। একটি হলো মুনাফা করা এবং সেই সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। মানে, মুনাফা করতে গিয়ে অর্থ বিনিয়োগ করে সেগুলোর ঝুঁকি এড়ানো বা সামাল দেওয়া–এটা হলো প্রধান কাজ। তার সঙ্গে আরেকটি হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। শুধু মুনাফা করবে, ঝুঁকি ব্যবস্থা করবে দিনের পর দিন, সেটা নয় । সামাজিক দায়বদ্ধতাও লাগবে ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক বা নন-ব্যাংক) এর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ব্যাংক বা নন-ব্যাংক ফিন্যানশিয়াল ইনস্টিটিউটগুলোকেও প্রফিট করতে হয়। ওদের জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওরা মানুষের আমানতের টাকা নেয়। বিভিন্ন জায়গা থেকেও অর্থ আহরণ করে। তারপর বিভিন্ন ব্যবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগ করে। অতএব, এটার মধ্যে ঝুঁকি থাকে।
কারণ যে টাকাটা জামানত হিসেবে নেয়, সে টাকাটা কিন্তু ব্যাংকের দায়। এ দায়টার বিপরীতে ওরা বিভিন্ন অ্যাসেট ক্রিয়েট করে। ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করে। সেটা হলো তাদের সম্পদ, সেখান থেকে রিটার্ন আসে।
ওদিক থেকে রিটার্ন যদি না আসে, তাহলে কিন্তু ওদের বিপদ হয়। এ জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আর্থিক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাটা এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এ কারণে বিনিয়োগকারী বা আমানতকারী যারা টাকা নিয়ে বিনিয়োগ করবেন, তাঁদের আস্থায় রাখতে হবে।
আমরা দেখছি যে এখন ব্যাংকিংয়ের যে অবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাটা খুব সাবলীল হচ্ছে না। ব্যাংকে দিন দিন খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ব্যাংকের মূলধন, পুঁজি ও বিনিয়োগ সংরক্ষণ করতে হবে–এটা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল বিষয়। এখান থেকে রিটার্ন আসবে। আমি বলব যে ঝুঁকি ব্যবস্থার দিকে আমাদের ব্যাংকগুলো কিন্তু অনেক পিছিয়ে আছে ।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিকগুলো
মূলধন অনুপাতে ঋণ: এখন আমি আসি ব্যাংকের বিশেষ কিছু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিকে। প্রথমত, ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য যেটা সাধারণত ধরা হয়, সেটা হলো ব্যাংকের মূলধন কেমন আছে। তারপর ঋণের বিপরীতে যথেষ্ট জামানত আছে কি না। যে ব্যবসায় ঋণ দেয়, সেটার সম্ভাবনা কী। তারপর ঋণ দিয়ে ঋণের অর্থটা ফেরত আসা। সবচেয়ে গু হলো–যারা ব্যাংকের ঋণ দেন, ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অফিসার সেটার ডিউ ডিলিজেপ ভালোভাবে করেন কি না। যাদের ঋণ দেওয়া হয়, তাঁদের শোধ করার অভ্যাস ও ক্ষমতা আছে কি না। এবং তাঁর অন্যান্য ব্যাবসায়িক লেনদেন কেমন। অতএব, এই জিনিসগুলো দেখতে হবে।
দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: এখন আমরা যদি দেখি বাংলাদেশে যে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাটা আছে, বেশির ভাগ ব্যাংকে কিন্তু মূলধন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ক্যাপিটাল কিন্তু একটা ব্যাংকের মূ বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিং আছে। এখানের ‘সিটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাপিটাল কমে গেলে তাদের ঋণ দেওয়ার ক্যাপাসিটি কমে যায়। তারপর ইনকাম কমে যায়। এবং এটা ক্ষয় হয় বেশি খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে, ব্যাংকের টাকা যদি কেউ নিয়ে আর না দেন বা ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে যদি অনিয়ম হয়।
ক্রেডিট রিস্ক: এখন মূলধনের মূল ভিত্তি যদি না থাকে, তখন লোকজনের আস্থা কমে যায়। এ প্রসঙ্গে আমি আসি, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড যেগুলো আছে, বাসেল ওয়ান, বাসেল টু, থ্রি- এখানে কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় ক্যাপিটাল এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাটাকে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে ঝুঁকি আছে, এটাকে ক্রেডিট রিস্ক বলে।
অপারেশন রিস্ক: আরেকটি ঝুঁকি হলো ম্যানেজমেন্ট, যেটাকে আমরা বলি অপারেশন রিস্ক। মানে ব্যাংকগুলো ঠিকমতো ম্যানেজ করতে পারছে কি না।
মার্কেট রিস্ক: তৃতীয় হলো মার্কেট রিস্ক। মার্কেটটা ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল কি না। কারণ মার্কেট ব্যবসাকে প্রভাবিত করে। এগুলোর ব্যাপকতা এত বেশি যে ব্যাংকে তো অ্যাফেক্ট, করে, আমানতকারীদের অ্যাফেক্ট করে, যারা ঋণ নেয় তাদের অ্যাফেক্ট করে। এখানে শুধু যারা ওয়েল কানেক্টেড, যারা বড় বড় ঋণী, যারা ডিফল্ট করছে, তাদের তেমন অ্যাফেক্ট করে না। কিন্তু এটা ব্যাংকের প্রফিট অ্যাবিলিটি, লোন অ্যাবিলিটি–সব কিছু আঘাত করে। কারণ লোন যদি ডিফল্ট হয়, ইনকাম অ্যাকাউন্টে যদি ব্যাংকের টাকা না থাকে, তাহলে প্রফিট কোত্থেকে হবে। ব্যাংকগুলোর বেশি প্রফিটের কারণ: ইদানীং দেখছি অনেক ব্যাংক প্রফিট করছে। প্রফিটটা অনেকটা ওরা করে, যেটাকে আমরা বলি অব ব্যালান্স শিট আইটেম–ঋণ দিয়ে নয়, এটা করে এলসি খোলার চার্জ, ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার চার্জ, ব্যাংকের অন্যান্য সার্ভিস দেয়, সেগুলো থেকে চার্জ নেয়। ওটার বিপরীতে আসে। আসল কাজ যেটা লোন দেওয়া, সেটার বিপরীতে ব্যাংকের তেমন ইনকাম নেই–কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্ট্যান্ডার্ড
সভরেন রেটিং: ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কতগুলো স্ট্যান্ডার্ড আছে, যেটা আমি বললাম যে বাসেল ওয়ান-টু-থ্রি এবং ক্যামেলস রেটিং আছে বাংলাদেশে। আর্থিক খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দেখার জন্য কিছু ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি আছে–ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি বলে ওদেরকে, ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা, সেটার জন্য মুডিস, এসঅ্যান্ডপি, ফিচ–কতগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের জন্য মুডিস ও এসঅ্যান্ডপি বাংলাদেশের সার্বিক ঋণমানের মূল্যায়ন কমিয়ে দিয়েছে। ডাউন গ্রেড করেছে। এবং আউটলুকটীকে বলেছে নট গুড, আউটলুকটা পজিটিভ নয়।
এই নেতিবাচক রেটিং হওয়ায় এটাকে আমরা সভরেন রেটিং বলি। এই সভরেন রেটিং গুরুত্বপূর্ণ, এটা বাংলাদেশ ব্যাংকে আমার সময়ে চালু করে দিয়ে আসা হয়েছিল, এখনো চলছে। সব দেশেই সভরেন রেটিং করে।
প্রাইভেট সেক্টরে রেটিং: আরেকটি আছে প্রাইভেট সেক্টরে রেটিং। যেসব সংস্থা ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, এটার জন্য বাংলাদেশে প্রাইভেট রেটিং সংস্থা আছে। যেমন— তারপর কতগুলো সংস্থা আছে। এটাকে কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক রিকগনাইজ করে। সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনও কিন্তু তাদের লাইসেন্স দেয়। কারণ ওই ক্রেডিট রেটিং ছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে না এবং ক্রেডিট রেটিং ছাড়া আইপিওতে যেতে পারবে না অর্থাৎ শেয়ার মার্কেটেও যেতে পারবে না। এখন সভরেন রেটিংটা কমে গেছে। ক্রিসিল, ক্র্যাবসহ অন্য এজেন্সিগুলো কিন্তু খুব চিন্তিত আছে। কারণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিল্পের জন্য যে ক্রেডিট রেটিংটা ওরা করছে, এটা কিন্তু বাংলাদেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কাজটি সফলতার সঙ্গে করা যায়নি।
সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ
প্রথমত, অনেক রুলস রেগুলেশন ব্যাংক, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা মানেন না। দ্বিতীয়ত, এক্সটারনাল ক্রেডিট এজেন্সিগুলোও কিন্তু সঠিকভাবে এটাকে এনফোর্স করতে পারে না। এর জন্য যেটা হচ্ছে, বাইরে থেকে ঋণ আনার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ক্রেডিট রেটিং কমে গেলে এলসি খোলার সময় বিদেশি ব্যাংকগুলো আলাদা একটা চার্জ করে। অনেক সময় এলসি খুলতেই রাজি হয় না। বলে, এটা বিশেষ ব্যাংক ছাড়া খোলা হয়েছে, এলসি গ্রহণ করবে না।
যে কারণে সুদহার বেশি হয়: তারপর বাইরে থেকে যদি আমরা ঋণ আনি, যেটা দ্বিপক্ষীয় ঋণ এবং বিদেশের প্রাইভেট সেক্টর থেকে আমরা যদি ঋণ নেই সে ক্ষেত্রে রেট অব ইন্টারেস্ট (সুদের হার) বেশি হয়, কারণ মূল সুদের হারের ওপর বাড়তি চার্জ যোগ করা হয়। একটা মূল রেট থাকে, এটার সঙ্গে কান্ট্রি রিস্ক যোগ করে। উদাহরণস্বরূপ অনেক দেশ, যেমন– নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ইউএসএ, ইউকে–এদের কান্ট্রি রিস্ক কিন্তু প্রায় শূন্য। ব্যাংক তাদের ঋণ দিতে গেলে সেখানে মূল সুদের হারের ওপর বাড়তি চার্জ যোগ করে না।
ক্রেডিট রেটিংট ডাউন: আমাদের ক্রেডিট রেটিংটা যে ডাউন গ্রেড হয়েছে, এটা কিন্তু শুধু ব্যাংকিং সেক্টরের সমস্যার জন্যই নয়। তারা দেখেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা, সুশাসনের অবস্থা, বাংলাদেশের নানা রকম চ্যালেঞ্জের অবস্থা এবং কোনগুলো আমাদের অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের প্রতি হুমকি, সেটা দেখেছে। তারপর এখানে মানি লন্ডারিং, দুর্নীতি–এগুলো কিন্তু পর্যালোচনা করা হয়েছে।
সংস্থার গভর্ন্যান্স: ক্রেডিট রেটিংটা শুধু ঋণ দিচ্ছে, ঋণ নিচ্ছে, এটা কিন্তু নয়; এটা ঋণমানের পেছনে, ঋণ দেওয়ার পেছনে যেসব পরিবেশ, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার যে কর্মদক্ষতা, নিয়ন্ত্রণ কিভাবে হচ্ছে, স্বচ্ছতা এবং রাজনীতি । রাজনীতিটা হলো মূল। রাজনীতি কিভাবে কাজ করছে এটা তো সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পর্কে প্রশ্ন আছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন নিয়ে প্রশ্ন আছে, বিটিআরসি নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারপর ব্যাংকগুলো এবং অন্যান্য সংস্থার গভর্ন্যান্স। গভর্ন্যান্সটা ভালো না হলে দেশীয় ক্রেডিট এজেন্সিগুলো যারা দেশের সেক্টরাল বিভিন্ন খাতে, বিভিন্ন শিল্পের ক্রেডিট রেটিং করে সেগুলোও তো বিশ্বাসযোগ্য হবে না। কারণ যে ব্যাংকের জন্য করল, তারা হয়তো এটা মেনিপুলেট করল বা যেসব তথ্য দিল সেগুলোও তো ভুল হতে পারে। হয়তো বা এটার ওপর বেসিস করে ভালো রেটিং পেয়ে গেল ।
আমাদের যা করতে হবে
অতএব, এই জিনিসগুলোর ব্যাপকতা এত বেশি এটা নিয়ে কিন্তু আমাদের সিরিয়াসলি চিন্তা করতে হবে। এটা দেশের ভেতরে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য। দেশের বাইরে বহির্বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমাদের ঋণ, আমাদের অর্থায়ন–সব কিছু প্রভাবিত করে। আমাদের ফরেন রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। আমাদের এফডিআই বাড়াতে হবে। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিদেশের ব্যবসায়ীরা কী কারণে আসবেন, যখন দেখবেন বাংলাদেশে ক্রেডিট রেটিং কমে যাচ্ছে। এবং বিভিন্ন সেক্টরে যে ক্রেডিট রেটিংগুলো করছে সেগুলো কিন্তু খুব সন্তোষজনক নয় । অতএব, এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আসবেন কেন।
আমাদের সমস্যার গভীরে যেতে হবে। মুডিস, এসঅ্যান্ডপি কি করল না করল, বাড়িয়েছে কি কমিয়েছে–সেটা একটা সিগন্যাল। এই সিগন্যাল দিয়ে কিন্তু আমাদের নিজস্ব রিফরম বা সংস্থার করতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরে রিফরম করতে হবে। আমাদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা, সততা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। এবং এখানে মানি লন্ডারিং, ভক্তি– এসব ব্যাপারে অ্যাড্রেস করতে হবে, না করলে কিন্তু আমাদের সার্বিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে সমস্যা হবে। অতএব, ক্রেডিট রেটিংটা আমাদের জন্য একটা লেসন–ফুড ফর এট মানে আমাদের চিন্তার একটা খোরাক জুগিয়েছে। আমরা শুধু আর্থিক খাত নয়, সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য, সামনে যাওয়ার জন্য আমরা কী কী পদক্ষেপ নেব সে সম্পর্কে এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক, অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র: কালেরকণ্ঠ