প্রশ্নঃ২- সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অর্থনীতিতে কি ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে? ব্যাখ্যা করুন ৷
ভূমিকা
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১ জুলাই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করল। মুদ্রানীতির সময়কাল হলো জুলাই ডিসেম্বর। যদিও এই নাতুন মুদ্রানীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। তবে দুই একটি জায়গাতে সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের বেসামাল অর্থনীতিকে সামাল দিতেই এই সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা হয়। অনেকেই প্রশ্ন করে দেশের অর্থনীতি কেমন যেন স্থির অবস্থায় রয়েছে, ঠিক অগ্রগতি বা অবনতি কোনোটাই লক্ষ্য করা যায় না। এ কারণেই ব্যাখ্যা করা যাক অর্থনীতির কেন এই স্থবরিতা। যদিও অর্থ উপদেষ্টা সরকারের শুধু ভুল আর নেতিবাচক বিষয়গুলো না দেখে ভালো বিষয়গুলোও দেখার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সরকারের ভালো বিষয়গুলোকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখার পরামর্শ দেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি কুফল
একাদশ শতাব্দীতে কাগজের মুদ্রা প্রচলনের ফলে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। তবে এসব মূল্যস্ফীতি তুলনায় আজকের মূল্যস্ফীতি বেশি ক্ষতিকর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে ১৯২৩ সালে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হারছিল ২৯ হাজার ৫০০ শতাংশ। অর্থাৎ দৈনিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২০ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ধরনের প্রলয়ংকরী মূল্যস্ফীতির ফলেই জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি সরকার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৯০ সালে পেরুতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ হাজার ৪৮৫ শতাংশ। আবার ফরাসি বিপ্লবে বাজিল দুর্গ আঘাতের মাধ্যমে যে বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল তার পিছনেও ছিল ব্যাপক মূল্যস্ফীতি, এছাড়াও পৃথিবীর বুকে যত বিপ্লব, অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে সবকিছুর পেছনে রয়েছে দুঃশাসন ও মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশে গত বছর ঘটে যাওয়া জুলাই অভ্যুত্থান বৈষম্য ছাত্রের ব্যানারে হলেও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণের অন্যতম একটি কারণ হলো মূল্যস্ফীতি ও দুঃশাসন। যা সাধারণশ মানুষের দৈনন্দিন কর্মজীবনকে নাভিশ্বাস করেছিল। এ কারণে বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার শুরু থেকে ঘোষিত সব মুদ্রানীতি এবং জাতীয় বাজেট সবকিছুতে সংকোচনমূলক বা কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছেন।
মুদ্রানীতি কিভাবে হয়
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কাজের মধ্যে অন্যতম কাজ হলো মুদ্রানীতি ঘোষণা করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনৈতিক অবস্থা বিচার বিশ্লেষণ করে কখনো সংকোচনমূলক আবার কখনো সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যেহেতু বেসামাল এবং মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের উপরে ছিল, (যদিও গত জুনে মূল্যস্ফীর্তি ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ)।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি
তাই এই বেসামাল অর্থনীতিকে এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি কে নিয়ন্ত্রণে অনার জন্য মুদ্রা সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয় সর্তমান সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অন্যতম উপাদান হলো টাকার ছাপাবে কিনা, টাকা ছাপালে কি হবে, না ছাপালে কি হবে, সুদের হার কেমন হবে, এসএলআর এবং সিআরআর কত হবে ইত্যাদি।
মূল্যস্ফীতিকে কাঙ্ক্ষিত স্থানে নিয়ে আসা
প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, অর্থনীতির বিষয়গুলো এতটাই পারস্পরিক এবং স্ববিরোধী যে, এর একটি উপাদান বাড়লে অন্য উপাদান বাড়বে নতুবা কমবে। যেমন মূল্যস্ফীতি মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়ার ফলে দেশের সুদের হার বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান কমে যাবে, মুদ্রার মান বৃদ্ধি পাবে, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে আসবে, ফলে দ্রব্যমূল্যের দামও হ্রাস পাবে, তবেই মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আসবে। মূল্যস্ফীতিকে কাঙ্ক্ষিত স্থানে নিয়ে আসতে অপর একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসবে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ বহুলাংশে হ্রাস পাওয়ার ফলে কর্মসংস্থানের ব্যাপক অভাব দেখা যাবে।
মুদ্রা সংকোচন নীতি কেন সহসাই গ্রহণ করে না
এ কারণেই কোন দেশ খুব সহজে মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহণ করে না। যদি কোনো রাষ্ট্র মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহণ করে তাহলে ওই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উপাদানগুলোর অবস্থানের একটু তারতম ঘটে এবং কিছু উপাদান এলোমেলো হয়ে যায়। একটু সহজ ভাবে উদাহরণ দিয়ে বললে বিষয়টা সহজেই সবার বোধগম্য হবে। এবারের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদ হার অপরিবর্তিত ১০ শতাংশে রয়েছে। নীতি সুদ হার হলো বাংলাদেশ ব্যাংক তার তফসিলি ব্যাংকে ছয় মেয়াদে একটি নির্দিষ্ট হারে বা সুদের বিনিময়ে স্বল্প মেয়াদে ঋণ দিয়ে থাকে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তারল্য, এসএলআর এবং সিআরআর মিটানোর জন্য অনেক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক হতে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এর জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সরকারি সিকিউরিটি বন্ড আমানত হিসেবে রাখার বিপরীতে স্বল্প মেয়াদের ঋণ নেয়। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এক রাতের জন্য স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) মাধ্যমে অর্থ ঋণ নিলে গুনতে হয় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ সুদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগুলোর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের কাছ থেকে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হয় এবং উচ্চ সুদে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করতে হয়। ফলশ্রুতিতে বিনিয়োগ কমে যায় এবং কর্মসংস্থানের ব্যাঘাত ঘটে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ
এছাড়াও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএলআর এবং সিআরআর নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে বাধ্য হয়। এই জামার ক্ষেত্রে কোন ব্যাংক ব্যর্থ হলে তাকে জরিমানা দিতে হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের র্যাঙ্কিং এ ব্যাংকগুলো বাংলাদেশে গত বছর ঘটে যাওয়া জুলাই অভ্যুত্থান বৈষম্য ছাত্রের ব্যানারে হলেও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণের অন্যতম একটি কারণ হলো মূল্যস্ফীতি ও দুঃশাসন। যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কর্মজীবনকে নাভিশ্বাস করেছিল। এ কারণে বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার শুরু থেকে ঘোষিত সব মুদ্রানীতি এবং জাতীয় বাজেট সবকিছুতে সংকোচনমূলক বা কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছেন ।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নিজেদের সংগ্রহ করতে হয়
সংকোচন মুদ্রানীতির ফলে ঋণ প্রসাওে পিছিয়ে পড়ে। ফলে ওই ব্যাংকগুলোর সুনাম নষ্ট হয়। যে কারণে উচ্চ সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখানেও একটি সূত্র আরোপ করে থাকে। বাজারে যদি তারল্য সংকট না থাকে তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক কখনোই তারল্য ঘাটতিতে পড়া ব্যাংকটিকে নীতি সুদ হরের মাধ্যমে তারুল্যের জোগান দেবে না। ফলে ওই ব্যাংকটিকে বাধ্য হয়ে বাজার হতে অথবা অন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক হতে তারল্য মেটাতে হয় এবং এর জন্য উচ্চ মূল্যে সুদ গুনতে হয়, যা আমরা কল মানি হিসেবে জানি।
এসডিএফ এর অপরদিকটাও দেখতে হবে
এই সূত্রটির অন্য একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। সেটি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দক্ষতার বিনিময়ে সফলতা অর্জন করছে। যে ব্যাংকগুলো কল মানির মাধ্যমে অর্থ লগ্নি করে, সূত্রের বেড়াজালে পড়ে কিছু ব্যাংক দক্ষতার অভাবে লোকসানে পড়ছে আবার কিছু ব্যাংক তারা সাধারণ কাস্টমারের মধ্যে ঋণ বিতরণ বা বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হয়। ফলে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিতে তারা প্রবেশ তারা প্রবেশ করে না। বঞ্চিত হয় সাধারণ ঋণগ্রহীতারা। তাই এই জায়গাটিতে আরও সুক্ষ্মভাবে বিচার বিশ্লেষদের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) এর মাধ্যমে কোন ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থ জমা রাখলে তার বিপরীতে ওই ব্যাংক ৮ শতাংশ হারে সুদ পায়। এ বিষয়টি বর্তমান বাজার অনুযায়ী ঠিক আছে বলে মনে হয়। কারণ ৮ শতাংশ হারে। বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার চেয়ে সাধারণ ঋণ গ্রহীতাদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কালে ব্যাংক বেশি লাভবান হবে, যা সমাজের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে এবং মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
ঘাটতি বাজেটে যা ঘটে
সরকার এমনিতে ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে। ঘাটতি বাজেটের ফলে সরকার সঞ্চয় পত্র, সিকিউরিটি বন্ড এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো হতে সরাসরি ঋণ গ্রহণ করে এবং এর জন্যও অর্থনীতিতে তারুল্যের ঘাটতি দেখা যায়। ফলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে যায়, বেকারত্ব বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি প্রণয়নকারী বিভাগটিকে আরও বিচার বিশ্লেষণ করে দক্ষত সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ । আনতে গিয়ে দেশের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে যেন ফেলা না হয়।
নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন
সরকার আরও একটি গৃহীত পদক্ষেপ হচ্ছে নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন। যেখানে দেশকে আরও মূল্যস্ফীতির দিকে ঠেলে দিবে। তাই এখনই সময় সব বিষয়কে একত্র করে সঠিক ও দিকনির্দেশনামূলক নীতি প্রণয়ন করা, যা দেশের অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী করে মজবুত করবে এবং দেশের অর্থনীতি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে বিশ্ব দরবারে । শত ঝড় ঝান্ডা পেরিয়ে • দেশের অর্থনীতি স্বমহিমায় দ্বগৌরবে বিশ্ব দরবারে আসীন হবে। এটাই সবার প্রত্যাশা।
মো. আকতার হোসাইন। লেখক: ব্যাংকার। সূত্র: শেয়ারবিজ নিউজ।