শিল্প বিপ্লবের পর থেকে অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, জীবাশ্ম জ্বালানির অপব্যবহার, বন উজাড়, এছাড়া কিছু কৃষি ও শিল্প থেকে নির্গত গ্রিনহাউজ গ্যাস বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। এই জলবায়ু পরিবর্তন পরিবেশের ওপর ক্রমবর্ধমান বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। উচ্চ তাপমাত্রা ও তীব্র ঝড়, খরা ও চরম বৈরী আবহাওয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে পৃথিবী ক্রমশ বসবাসের উপযোগিতা হারাচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বরফগলার হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি অদূর ভবিষ্যতে উষ্ণতা হ্রাসের প্রচেষ্টা সফলও হয়, তবুও সমুদ্র উত্তাপ, মহাসাগরের অনুকরণ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত প্রভাব শতাব্দী ধরে চলতে থাকবে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
২০১৫ সালের প্যারিস-চুক্তির অধীনে, দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে প্রাক- শিল্পযুগের (১৮৫০-১৯০০ সালের) গড় তাপমাত্রার তুলনায় দুই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে বজায় রাখতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো চুক্তির অধীনে করা অঙ্গীকারের কোনো ধারাই সত্যিকার অর্থে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলো মেনে চলছে না। উষ্ণতাকে ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে সীমাবদ্ধ করার জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন অর্ধেক করতে হবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী নির্গমন ও শোষণের পরিমাণ ‘নিটশূন্য’ অর্জন করতে হবে। যা বিশ্বের অধিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোর আচরণে সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বিশেষ করে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। আমাদের দেশে উপকূলীয় এলাকা গ্লাবিত হচ্ছে। ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা, জলাভূমির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা ও পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। এছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও পানির দূষণের কারণে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও পানিবাহিত রোগের প্রার্দুভাবজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ যদিও ইতিমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ এবং আর্ন্তজাতিক পরিমণ্ডলে একাধিক পদক্ষেপে অংশগ্রহণ করছে, যেমন-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্রাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (BCCSAP); বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF); অভিযোজন ও মিটিগেশন কর্মসূচি; আর্ন্তজাতিক অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা; কমিউনিটি-ভিত্তিক অভিযোজন, তবুও এখন পর্যন্ত আপাতদৃষ্টিতে এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের জনগণের জীবনমান রক্ষায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় খুব সামান্যই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। তাই ১৩ নভেম্বর আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে কগ-২৯ (Conference of the parties) ওয়ার্ল্ড লিডারস ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটের উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে অন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে নতুন বিশ্ব গড়তে ‘তিন শূন্য’ তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাগুলো মানবসৃষ্ট-এ সমস্যার সমাধানে ও সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে এবং এজন্য জরুরি শূন্য কার্বন, শূন্য দারিদ্র্য ও শূন্য বেকারত্ব তত্ত্বের যথাযথ প্রয়োগ।
শূন্য নিঃসারণের লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনের মূলকারণ কার্বন ডাইঅক্সাইড-সহ সব গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসারণ কমিয়ে সর্বনিম্ন করা। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ সব দেশে সোলার হোম সিস্টেমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হলে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে শক্তির বিকল্প উৎসের ব্যবহার বাড়বে । তাছাড়া বায়ু, হাইড্রো-এমনকি পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে অনাকাঙ্ক্ষিত গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস করা সম্ভব। তদুপরি বিশ্বে জীবাশ্ম জ্বালানি শক্তির পরিবর্তে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব হলে শূন্য নিঃসারণ মো অসম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত শূন্য দারিদ্র্যের মর্মকথা হলো দারিদ্র্য কমানোর মাধ্যমে মানুষকে – পরিবেশসচেতন এবং টেকসই জীবনধারায় উৎসাহিত করা। বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিজেই দারিদ্র্য সৃষ্টি করে এবং এই ব্যবস্থার অধীনে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। মানুষ এককভাবে দারিদ্র্য তৈরি করে না, বরং অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরই তৈরি হয় দারিদ্র্য। দারিদ্র্য হ্রাসের মাধ্যমে বননিধনসহ অতিরিক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের প্রবণতা হ্রাস পাবে। এছাড়াও তেমনি দেশীয় এনজিও (বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেমন-গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশার মতো প্রতিষ্ঠান) সামাজিক উদ্যোগ, যেমন-টেকসই কৃষি ও শিল্প এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব হলে, তা পরিবেশের ওপর চাপ কমাবে। এছাড়াও নবায়নযোগ্য শক্তি বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিখাতে সবুজ চাকরির সুযোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করে দারিদ্র্য হ্রাস করা সম্ভব।
তৃতীয়ত ‘শূন্য বেকারত্ব’ বলতে এমন একটি সমাজব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে কর্মক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তি তার দক্ষতা অনুযায়ী একটি অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পারে । এটি বাস্তবায়নের জন্য তিনি সামাজিক ব্যবসার ধারণাকে উৎসাহিত করেন। সামাজিক ব্যবসাকে সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য ননডিভিডেন্ট ব্যবসা হিসেবে মনে করেন যার বিশাল অংশ পরিবেশ ও মানবজাতির সুরক্ষায় মনোযোগ দেবে। প্রধান উপদেষ্টা নতুন পৃথিবী বিনির্মাণে এই তিন শূন্য তত্ত্বের সঙ্গে এবার তরুণদেরও যুক্ত করেছেন। তরুণেরা ‘তিন শূন্য’ তত্ত্বের জীবনধারাভিত্তিক ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠলে পৃথিবী হয়ে উঠবে বাসযোগ্য কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের জায়গা। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে এ তত্ত্বের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হবে ।
লেখক: ড. দিলীপ কুমার সাহা (সাবেক প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক, সিআইডি) প্রকাশ: ২ ডিসেম্বর ২০২৪, দৈনিক ইত্তেফাক