বাজেট অচলাবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের নীতিও ঝুঁকিতে, বিশেষ করে রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও আন্তর্জাতিক সহায়তার দিক থেকে। মার্কিন সরকারের শাটডাউন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন অর্থনৈতিক বাজেট ও অচলাবস্থার ঝড়
মার্কিন কংগ্রেসকে প্রতিবছর ১ অক্টোবরের আগে ৪৩৮টি সরকারি সংস্থাকে অর্থ বরাদ্দ করতে আইনপ্রণেতারা এই সময়সীমা খুব কমই মেনে চলেন এবং প্রায়ই একটি সম্পূর্ণ বাজেট পাস না হওয়া পর্যন্ত সরকারকে সচল রাখতে স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন বিল (টেম্পোরারি স্পেন্ডিং বিল) পাস করেন। না হলে সরকারের অপরিহার্য নয় এমন সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং সরকার অচলাবস্থা বা শাটডাউনের মধ্যে পড়ে। ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানদের মতভেদ, বিশেষত স্বাস্থ্যভর্তুকি ও ব্যয় বিল নিয়ে বিরোধ, এই শাটডাউনের মূল কারণ। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় এসব বিরোধ আরও তীব্র হয়, যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্য খাতে কাটছাঁটের প্রস্তাব আসে। কংগ্রেস এখনো পূর্ণ বাজেট বা অস্থায়ী চুক্তি পাস করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি বাজেট চালিয়ে আসছে এবং ২০২৪ সালে শুধু সুদ পরিশোধেই ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। এই বিশাল ঘাটতি বিশ্ব অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করছে। ডলার ও অস্ত্রের জোরে যুক্তরাষ্ট্র এখনও প্রভাব বিস্তার করলেও, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তা টিকিয়ে রাখার জন্য বৈরী রাষ্ট্রগুলোকেও ভূমিকা রাখতে বাধ্য করছে।
বিশ্বব্যাপী প্রভাব : বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সংকোচন
মার্কিন ‘পারস্পরিক’ শুল্ক নীতিসহ অন্যান্য বাণিজ্য নীতির প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এই নীতিতে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ০.৯% কমবে এবং মূল্যস্ফীতি ১% পয়েন্ট বাড়বে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশ মার্কিন আমদানি হ্রাস ও প্রতিশোধমূলক শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুল্কের খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ফলে প্রতিযোগিতা কমছে। কৃষি রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠনের চাপে রয়েছে। ওইসিডি বিশ্ব প্রবৃদ্ধিতে স্থিতিশীলতা দেখলেও মার্কিন নীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে। উচ্চতর শক্তি উৎপাদন তেলের দাম কমাচ্ছে, আর প্রযুক্তি খাতে শুল্ক খরচ বাড়াচ্ছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ রেমিটেন্স ও শ্রম প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা প্রেরণকারী দেশগুলোর অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে।
বাংলাদেশে শাটডাউনের প্রভাব
রপ্তানি খাতে প্রভাব: যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি হ্রাস পেতে পারে (স্বল্পমেয়াদে ০.৫%, * দীর্ঘমেয়াদে ৩-৭%)। অর্ডার বিলম্ব ও কাস্টমস প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিতে
রেমিট্যান্স হ্রাস: স্বল্পমেয়াদে কিছুটা হ্রাস পেলেও দীর্ঘমেয়াদে ৫-১২% পর্যন্ত রেমিটেন্স। কমতে পারে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব: বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.২-০.৬ শতাংশ পয়েন্ট কমে যেতে পারে। •
রিজার্ভে চাপ: রপ্তানি ও রেমিটেন্স কমায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।.
আন্তর্জাতিক সহায়তা বিলম্ব: রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু অভিযোজন খাতে সহায়তা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব: “আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে চীন ও ভারতের সঙ্গে কৌশলগত দরকষাকষিতে দুর্বলতা সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশকে বিকল্প কূটনৈতিক ভারসাম্য খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের করণীয়
অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও বাজার সম্প্রসারণ
তৈরি পোশাকের বাইরে উচ্চমূল্যের খাত যেমন- তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি/আইটিইএস), ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল বিকল্প বাজার যেমন: ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, কানাডা, ভারত, চীন, আসিয়ানের দেশসমূহে
অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংস্কার ও স্থিতিশীলতা
রাজস্ব আদায় পদ্ধতির উন্নয়ন।
ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন।
মুদ্রা বিনিময় নীতিতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার
আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের কার্যকারিতা বৃদ্ধি।
বৈশ্বিক ফোরামে সক্রিয়তা বাড়াতে হবে।
জিএসপি পুনরুদ্ধার ও বাণিজ্য চুক্তির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।