বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ তরুণ। এই তরুণরাই দেশের প্রধান উৎপাদনশক্তি এবং উন্নয়নের চালিকাশক্তি। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের একটি বড় অংশের তরুণ আজ বেকার বা আংশিক বেকার অবস্থায় রয়েছে। কর্মসংস্থানের অভাব শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই উন্নত বাংলাদেশ গেনে তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তরুণ জনগোষ্ঠীর শক্তি
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের নিচে বয়স ৩৫ বছর। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীই দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ একটি • ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ, দেশের শ্রমক্ষম জনগোষ্ঠীর হার নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। যদি এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা। যায়, তবে বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে পরিণত হতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন যথাযথ কর্মসংস্থানের সুযোগ ও দক্ষতা উন্নয়ন।
বেকারত্বের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকারত্বের হার প্রায় ৪.৩ শতাংশ, তবে তরুণদের মধ্যে এই হার প্রায় ১২ শতাংশেরও বেশি। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু নতুন চাকরির সৃষ্টি হচ্ছে সর্বাধিক ১০-১২ লাখ। ফলে বিপুল সংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থান না পেয়ে হতাশ হচ্ছে বা বিদেশে কম মজুরির অদক্ষ কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে উত্তীর্ণ অনেক শিক্ষিত তরুণও চাকরির অভাবে বেকার থেকে যাচ্ছে। এতে একদিকে সামাজিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে মেধা ও শ্রম অপচয় হচ্ছে ।
অর্থনীতিতে বেকারত্বের প্রভাব
বেকারত্ব শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ভারসাম্য স্থিতিশীলতার রাজনৈতিক জন্যও হুমকি। বেকার তরুণরা হতাশায় ভোগে, যা থেকে কর্মসংস্থান অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্তি ও সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে উৎপাদন কমে যায়, অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস পায়, এবং রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী বেড়ে যায়। অর্থাৎ, বেকারত্ব জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দেয়।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্র ও সম্ভাবনা: বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন রাত বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে-
শিল্প ও উৎপাদন খাত: তৈরি পোশাক শিল্প এখনো দেশের সর্ববৃহৎ শ্রমনির্ভর খাত। তবে পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পেও তরুণদের যুক্ত করা যেতে পারে।
প্রযুক্তি ও আইটি খাত: ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির ফলে আইটি সেক্টরে
ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও ই-কমার্সে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প: আধুনিক কৃষি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং কৃষিপণ্য
প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেও তরুণদের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME): উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে
গতিশীল করা সম্ভব। সরকার ও ব্যাংকগুলো তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণসুবিধা দিতে পারে।
বৈদেশিক শ্রমবাজার: দক্ষতা উন্নয়ন করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় এম
রপ্তানি বাড়ানো গেলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের গুরুত্ব
শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, আধুনিক সময়ের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা (Skills) অর্জনই কর্মসংস্থানের মূল চাবিকাঠি। প্রচলিত পাঠ্যসূচিতে প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চাকরি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স সাজাতে হবে। সরকারের কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (TTC) এবং বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়া উচিত।
নীতিগত পদক্ষেপ ও সরকারি উদ্যোগ
সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় কর্মসংস্থান নীতি ২০২২, যুব নীতি, এবং স্টার্টআপ তহবিল চালু করেছে। এসব নীতির মূল লক্ষ্য হলো— তরুণদের স্বনিযুক্তি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এখনো সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় সরকার পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত যুব উন্নয়ন কার্যক্রমে একক নীতি দরকার।
বেসরকারি খাত ও সামাজিক দায়িত্ব
সরকার একা সব তরুণকে চাকরি দিতে পারবে না। তাই বেসরকারি খাত, শিল্প উদ্যোক্তা, এনজিও এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। তাদের উচিত কর্মমুখী ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু করা। পাশাপাশি কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (CSR) আওতায় যুব উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করাও সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম, দক্ষ এবং আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে হবে। বেকারত্ব এখন আর শুধু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, এটি জাতীয় ভবিষ্যতের প্রশ্ন। তরুণদের যদি উৎপাদনশীল খাতে সম্পৃক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা হবে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিশ্বে প্রশংসিত একটি মডেল। শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিল্প ও উদ্যোক্তা খাতে একযোগে পদক্ষেপই পারে আমাদের এই কর্মশক্তিকে প্রকৃত সম্পদে রূপ দিতে।
মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল, কলামিষ্ট ও শিল্পো-উদ্যোক্তা প্রকাশকাল: ১৬ অক্টোবর, দৈনিক ডেসটিনি।