বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক চমকপ্রদ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি থেকে আজ দেশটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের অবস্থানে পৌঁছেছে। কয়দিন পর দেশের নামের পাশে উন্নয়নশীল দেশের তকমাও যুক্ত হয়ে যাবে। কৃষি, তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, এবং সেবা খাতের অগ্রগতি দেশকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সামাজিক বৈষম্য, আঞ্চলিক অসমতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, মানবসম্পদ উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি প্রশ্ন তুলেছে যে এই প্রবৃদ্ধি আসলে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক। এই কারণেই অনেকে একে বলেন “বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্যারাডক্স” অর্থাৎ উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার সুফল সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্র:
• · স্বাধীনতার পর মাথাপিছু আয় ছিল ৯৪ মার্কিন ডলার। বিবিএস-এর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে অনুযায়ী যা বর্তমানে প্রায় ২,৮২০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।
গত এক দশকে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬-৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে বেশি।
তৈরি পোশাক খাত এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক, যা দেশের মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশেরও বেশি।
দারিদ্র্যের হার ১৯৯১ সালে ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ, যা এখন কমে ১৮ শতাংশের নিচে।
নারী শ্রম অংশগ্রহণ বেড়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, ডিজিটাল সংযোগ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে।
প্যারাডক্স বা আপাতস্ববিরোধী দিকগুলো: উপরে উল্লিখিত এসব তথ্য দেখে ধরে নেয়া যায় যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি সমানভাবে টেকসই বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়, আর এখানেই মূলত “প্যারাডক্স”। বাংলাদেশ গত দেড় দশক ধরে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও, এই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি এখনো বিদ্যমান। বাংলাদেশের উন্নয়নে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোগুলো প্রবৃদ্ধির প্যারাডক্সকে সহজে তুলে ধরে:
বৈষম্য বৃদ্ধি: বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, যা অর্থনৈতি সাফল্যের প্রতীক। যদিও রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থি বর্তমানে এ প্রবৃদ্ধিতে লাগাম দিয়েছে তারপরও গত এক দশকের হিসেবে এ প্রবৃদ্ধির হার উচ্চ হলেও, গিনি সহগ অনুযায়ী দেশে আয় বৈষম্য তীব্রভাবে বেড়েছে। প্রবৃদ্ধির সুবিধা মূলত ধনী এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষরা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে আরও চাপে পড়েছে। এই অসম বণ্টন প্রমাণ করে যে উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। আয়বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থা ভয়াবহ রকমের অস্থিতিশীল। ২০০৯ সালে। বাংলাদেশের গিনি সূচক ছিলো ০.৪৩২, যা তখন থেকেই উচ্চ বৈষম্যের পর্যায়ে ছিল। ২০২৪ সালে এসে এটি দাঁড়িয়েছে ০.৪৯৯ অর্থাৎ গত ১৫ বছরে আয়বৈষম্য বেড়েছে প্রায় ১৫.৫ শতাংশ। এই হারে বৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ ও দেউলিয়াত্বের শিকার হওয়া দুটি দেশও আমাদের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। অর্থাৎ আমাদের দেশে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, গরিবরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে।
কর্মসংস্থানের স্থবিরতা: উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বেকারত্বের অনেক বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বেকারত্বের হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেকেছে। চলতি অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর (২০২৪) শেষে দেশের বেকার জনগোষ্ঠী বেড়ে ২৭ লাখ ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বেকারের সংজ্ঞার মারপ্যাঁচে এটাই সত্য। কিন্তু দেশে প্রায় এক কোটির মতো মানুষ মনমতো কাজ পান না। তারা পড়াশোনা করেন না, কাজেও নেই। তাঁরা ছদ্মবেকার। কোনো রকম জীবনধারণের জন্য কাজ করেন।
রপ্তানি নির্ভরতার ঝুঁকি: দেশের রপ্তানির ৮০%-এর বেশি পোশাক খাতে সীমাবদ্ধ। এই একমুখী রপ্তানি নির্ভরতার ঝুঁকি হলো অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যহীনতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি বড় দুর্বলতা। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে তৈরি পোশাক খাত (RMG) থেকে। এই অত্যধিক নির্ভরতার কারণে বৈশ্বিক বাজারে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা, যেমন- অর্থনৈতিক মন্দা, বৈশ্বিক মহামারী, কিংবা ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে তীব্র আঘাত হানতে পারে। করোনা মহামারীর সময় একের পর এক পোশাক অর্ডার ক্যান্সেলের খবরগুলো আমাদের কাছে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন ছিলো। সেই ক্ষত কি কর্মীরা এখনো কাটিয়ে উঠেছে, তথাপি বাংলাদেশও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এই একটি একক পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মুখে দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দর কষাকষির ক্ষমতার কাছে দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে রাখে। আমরা এখনো রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে শতভাগ ব্যর্থ, কোনো অপ্রত্যাশিত ধাক্কা এলে তা দ্রুত বেকারত্ব বৃদ্ধি, রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে শ্লথ করতে একটুও কালক্ষেপণ করে না। তাহলে কোথায় আছি আমরা তা একবারো কি ভেবে দেখছি ।
কৃষিখাতের অবনমন: কৃষিখাতের অবনমন হলো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্যারাডক্সের আরেকটি দিক। জিডিপিতে কৃষির অবদান ২৫% থেকে নেমে এখন প্রায় ১২%, অথচ জনসংখ্যার বড় অংশ এই খাতেই নিয়োজিত। যদিও মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষিখাতের অংশীদারি কমে যাওয়া উন্নয়নশীল অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবণতা, তবে এর আপেক্ষিক অবনমন খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কৃষিতে পর্যাপ্ত সরকারি ভর্তুকি থাকা সত্ত্বেও, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বন্যা, খরা, কৃষি জমির দ্রুত হ্রাস এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কৃষকরা প্রায়শই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না। এই কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে এবং কৃষকদের একটি অংশ জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। যদি কৃষি খাতের এই দুর্বলতা অব্যাহত থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নয়, বরং গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনকেও কঠিন করে তুলবে।
সামাজিক সূচকে অসামঞ্জস্যতা: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু মানগত উন্নয়ন ধীর। স্বাস্থ্য ব্যয়ে সরকারি অংশগ্রহণ এখনও কম। যদিও বাংলাদেশ গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং নারী শিক্ষায় প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে ভালো করছে, যা সামাজিক উন্নয়নের ইতিবাচক দিক, কিন্তু এই সাফল্যের পাশাপাশি পুষ্টিহীনতা, মানসম্মত শিক্ষার অভাব, এবং স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মানের বিশাল আঞ্চলিক ও সামাজিক বৈষম্য বিদ্যমান। গ্রামীণ ও শহুরে স্বাস্থ্যসেবা এবং ধনী- দরিদ্রের মধ্যে মানসম্মত শিক্ষার প্রবেশাধিকারের ব্যবধান তীব্র। এছাড়া নারী শিক্ষায় অগ্রগতি সত্ত্বেও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে নিম্ন মজুরি বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামো তৈরি করে রেখেছে। দেশের প্রবৃদ্ধি সমাজের মৌলিক মানবিক নিরাপত্তা ও সমতা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি সফল হয়নি।
দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি: দারিদ্র্য বিমোচন, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের অর্জন দক্ষিণ এশিয়ায় প্রশংসিত। মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। এই সামাজিক অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, বিশেষ করে সুশাসন, দুর্নীতি | দমন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রকট। দুর্নীতির ব্যাপকতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফলকে ম্লান করে দিচ্ছে। · ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনের দুর্বলতা দেশের অর্থনীতিকে অভ্যন্তর থেকে দুর্বল করছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের ব্যাপকতা, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি প্রবৃদ্ধির সুফলকে একটি গোষ্ঠীর কাছে কেন্দ্রীভূত করে রেখেছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হয়, বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। যখন দুর্নীতি প্রবৃদ্ধি থেকে অর্জিত সম্পদকে অবৈধ উপায়ে দেশ থেকে পুঁজি পাচারে উৎসাহিত করে, তখন তা উন্নয়নের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং প্রবৃদ্ধিকে টেকসই হতে বাধা দেয়। আমাদের দেশের এইসব সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা: পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিগত সরকার দেশের সক্ষমতা ও দ্রুত উন্নয়নকে ফুলে ফেঁপে একাকার অবস্থায় দেখিয়েছিলো যা বাস্তবে মোটেও তেমন নয়। দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত বর্তমানে বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর প্রতি সরকারের ক্রমাগত সমর্থন পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে এসেছে। এই ভঙ্গুরতা উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির টেকসই ভবিষ্যতের জন্য গুরুতর হুমকি সেটা বলাই বাহুল্য।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: সরকার দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল’ ঘোষণা করে। চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ এবং টাকার দ্রুত অবমূল্যায়ন। এই দুর্বলতাগুলো দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি করেছে, জনগণের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির হার উচ্চ হলেও এর ভিত্তিগুলো দুর্বল এবং ভঙ্গুর। ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নামে একটি ভুল ধারণা তৈরি করা হচ্ছে জনগণের কাছে।
বিশ্লেষণ: উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করলে বলা চলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মূলত পরিমাণগত উন্নয়নে সাফল্য দেখালেও গুণগত দিকগুলো ততটা উন্নত হয়নি। একদিকে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্য রয়েছে, অন্যদিকে বৈষম্য, বেকারত্ব, সুশাসনের দুর্বলতা, মানবসম্পদের ঘাটতি এসব বিষয় প্রবৃদ্ধিকে অসম ও ভঙ্গুর করে তুলেছে। এই যে এই অসামঞ্জস্যই মূলত “প্যারাডক্স অব ডেভেলপমেন্ট”, যেখানে উন্নয়ন দৃশ্যমান, কিন্তু তা টেকসই নয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনকে বৈধতা দেয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বয়ান। এ বয়ানকে বৈধতা দিয়ে বহুজাতিক ঋণদাতাগোষ্ঠীগুলোও বাংলাদেশের উন্নয়নকে ‘মিরাকল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যদিও করোনা মহামারীর অভিঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাবে সেই ‘মিরাকলের’ অর্থনীতি কঠিন সংকটের মুখে পড়ে যায়। গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটে ফ্যাসিস্ট শাসনামলের। দীর্ঘ সময়ের দুঃশাসনের ফলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা সংহত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। বাংলাদেশে গত দুই দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও রাষ্ট্রের সক্ষমতা সেভাবে বাড়েনি। বিদ্যমান ধারা বজায় থাকলে ভবিষ্যতেও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা খুব বেশি বাড়ার সম্ভাবনা নেই। আমরা এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশ হয়ে যাওয়ার কেতাবি টার্মে আটকে আছি, অথচ একসময় অর্থনীতি ‘উন্নয়নশীল দেশের ফাঁদ’-এ আটকা পড়তে পারে তা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। অর্থনীতিবিদ ল্যান্ট প্রিচেটের একটা বক্তব্য তুলে ধরে বিশ্লেষণের ইতি টানি,
“বাংলাদেশ ২০০৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অথচ ওই সময়ে দেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ১-১০০ স্কেলে মাত্র এক পয়েন্ট বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরসের (ডব্লিউজিআই) রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা সূচক অনুযায়ী ২০২২ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল মাত্র ৩৩ দশমিক ৬। এই অপ্রতিসম গতি হলো ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয়, তবে এটিকে সত্যিকারের অর্থবহ উন্নয়ন করতে হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি ও শিল্পের ভারসাম্য রক্ষা, সুশাসন ও দুর্নীতির দমন এসবের সমন্বয়ে প্রবৃদ্ধির প্যারাডক্স কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বাংলাদেশের উন্নয়ন আপাতদৃষ্টিতে সফল হলেও তার অন্তর্নিহিত বৈষম্য ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে একে একধরনের “প্যারাডক্সিক্যাপ ডেভেলপমেন্ট” বলাই যথাযথ।