অসলো চুক্তি-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ৭ অক্টোবর হামাসের অভিযানের পটভূমিতে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ কিভাবে রূপান্তরিত হয়েছে, এবং ইসরায়েল ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ‘শান্তি’ ও ‘সংলাপ’-কেন্দ্রিক নীতি কীভাবে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করেছে?
গাজায় সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি বিজয় হলো জনগণের অবিচল মনোবল ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের প্রতিফলন, যা দল-মত ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ছিল, ইসরায়েলি দখলদারির সমাধান কেবল সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব। ‘শুধু সংলাপই শান্তি আনতে পারে’- এই ধারণা বহুস্থানে প্রচারিত হয় এবং এর ভিত্তিতে এক বিশাল শিল্পগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটে। এই ধারা বিশেষভাবে দৃশ্যমান ছিল পিএলও ও ইসরায়েলের মধ্যে অসলো চুক্তি ও পরবর্তী সময়ে, যা আলোচনাকেন্দ্রিক সমাধানকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু বাস্তবতা দেখায়, প্রতিরোধই অধিক কার্যকর পথ হতে পারে।
‘শান্তি’র অবসান
শান্তিপ্রক্রিয়ার নামে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যে ধারাটি প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা মূলত একতরফা শর্তে ফিলিস্তিনিদের আনুগত্য আদায়ের কৌশল ছিল। ‘শান্তি’, ‘সংলাপ’ কিংবা ‘বেদনাদায়ক ‘আপস’- ‘—এসব শব্দকে ব্যবহার করা হয়েছিল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবে। শান্তির নামে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে বাধ্য করা হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ ত্যাগ করতে, ইসরায়েলের কথিত ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে অস্তিত্ব মেনে নিতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে গিয়ে আলোচনা চালাতে।
আরাফাত নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) একপর্যায়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে সরে আসে ও জাতিসংঘের কিছু প্রস্তাবের সীমিত ব্যাখ্যায় রাজি হয়। তখনই যুক্তরাষ্ট্র ‘সংলাপ’-এ অংশ নেয়, যা হয় তিউনিসিয়ায় এবং ছিল একতরফাভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শর্তনির্ভর। এই প্রক্রিয়ায় আরাফাত ফিলিস্তিনি জনগণের মৌলিক স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হন। অসলো চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিরা কোনো সার্বভৌম স্বীকৃতি পায়নি, বরং শুধুমাত্র পিএ-কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যেটি পরে দুর্নীতিগ্রস্ত ও ইসরায়েলি দখলের সহায়ক একটি প্রশাসনে রূপ নেয়। এ সময়েই ইসরায়েল অবাধে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অভিযান চালায়, গাজায় অবরোধ আরোপ করে, নির্বিচারে ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও আটক করে এবং নারী-শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানায়। শান্তিপ্রক্রিয়ার সময়েই ১৯৬৭ সালের দখলকৃত জমির ওপর ইসরায়েলের দখল ও বসতি সম্প্রসারণ সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ঘটে।
অতএব, তথাকথিত ‘শান্তি’ ছিল আসলে এক বিভ্রান্তিকর পরিভাষা, যা ইসরায়েলি দখলদারির পৃষ্ঠপোষকতা করে। এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি জনগণ শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, বাস্তবিক অর্থেও ক্রমাগত নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত হয়েছে। শান্তির নামে চলা এ প্রহসনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা আরও দূরে সরে গেছে।
গাজা যেভাবে ব্যতিক্রম
গাজা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের এক ব্যতিক্রমী অংশ, যেখানে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এবং সংগঠিত থেকেছে। অন্যদিকে, পশ্চিম তীর ও অন্যান্য অঞ্চলে ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষ (পিএ) যৌথভাবে প্রতিরোধ আন্দোলন দমন করেছে। পিএর নেতা মাহমুদ আব্বাস ২০০৮ সালে সশস্ত্র প্রতিরোধকে ‘নিরর্থক’ বলে আখ্যা দেন এবং তাঁর নিরাপত্তাবাহিনী ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয়ে প্রতিরোধ দমন করে।
গাজায় প্রতিরোধের ইতিহাস বহু পুরনো—১৯৫০-এর দশকে ফেদায়িন আন্দোলন থেকে শুরু করে ইসলামি ও সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে তা আজ পর্যন্ত বজায় রয়েছে। গাজা কখনোই পুরোপুরি ইসরায়েল কিংবা পিএর নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ২০০৭ সালে ফাতাহ-হামাস সংঘর্ষে হামাসের বিজয়ের পর গাজা সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজার জনবসতি ছেড়ে দিলেও, অঞ্চলটিকে বাফার জোনে পরিণত করে কঠোর অবরোধ আরোপ করে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাসের বিজয় পশ্চিমা আরব মিত্রদের আতঙ্কিত করে তোলে, যারা আশঙ্কা করেছিল প্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। পশ্চিম তীরেও। এর জবাবে ইসরায়েল গাজার ওপর মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অবরোধ জোরদার করে, কিন্তু গাজা আত্মসমর্পণ করেনি।
২০০৮ সাল থেকে ইসরায়েল গাজার প্রতিরোধকে পূর্ণ সামরিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। একের পর এক বড় আকারের হামলা চালায় – ২০০৮-০৯, ২০১২, ২০১৪, ২০২১ এবং ২০২৩ সালে। প্রতিবারই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, বেসামরিক হতাহতের পরও গাজা প্রতিরোধ চালিয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘরবাড়ি গড়ে তোলা ও অবিস্ফোরিত গোলা দিয়ে অস্ত্র তৈরি করে গাজা প্রতিনিয়ত নিজেকে পুনর্গঠিত করেছে। এই দৃঢ়তা গাজাকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক করে তুলেছে।
৭ অক্টোবর: ইসরায়েলের ‘বিপর্যয়’
৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের হামাসের ‘আল-আকসা ফ্লাড’ অভিযান বহু বছরের স্থিতাবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ ছেদ সৃষ্টি করে। এটি ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের এক পরিণত রূপ, যা ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হয়েছিল। এই অভিযান ইসরায়েলকে জানিয়ে দেয়, লড়াইয়ের নিয়ম বদলে গেছে এবং অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা আর নিঃসহায় ভুক্তভোগী হয়ে থাকতে চায় না। ইসরায়েলের জন্য এটি ছিল এক গভীর ধাক্কা, যা তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা প্রকাশ করে এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের ক্ষমতা সম্পর্কে ভুল মূল্যায়নকে উন্মোচন করে।
এই ঘটনা ঘটে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কিছু আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে প্রায় বাদ দিয়েছিল। পশ্চিম তীরের দুর্বল নেতৃত্ব এবং গাজার অবরুদ্ধ অবস্থাকে সামনে রেখে ইসরায়েল মনে করেছিল, ফিলিস্তিন আর বড় কোনো প্রতিবন্ধক নয়। কিন্তু হামাসের অভিযানে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল ভেঙে পড়ে। প্রতিক্রিয়ায় তিনি যে ভয়াবহ সামরিক হামলা শুরু করেন, তা ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যায় রূপ নেয়। ইসরায়েল সরাসরি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত উৎখাত এবং নির্মূলের চেষ্টা চালায়। এর ফলে ইসরায়েল ও জায়নবাদী মতাদর্শের সহিংস প্রকৃতি প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। বিশ্ব, বিশেষত পশ্চিমা সমাজ, প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে দেখতে পায় ইসরায়েলের আসল চেহারা—এবং সে সব সময় কী ছিল।
গাজার প্রতিরোধ ও সহিষ্ণুতা এবং ইসরায়েলের পরাজয়
ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু আরব দেশকে একত্র করেছে এক অভিন্ন ভয়—ফিলিস্তিনে এবং সেখান থেকে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র প্রতিরোধের পুনরুত্থান। হিজবুল্লাহ ও আনসারাল্লাহর মতো গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা জোট এই ভয়ের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলে।
গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধেও ইসরায়েল তার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের অসাধারণ সহনশীলতা ও প্রতিরোধ বাহিনীর সামরিক সাফল্য—যেমন দুই হাজারের বেশি সামরিক যান ধ্বংস—ইসরায়েলকে গভীর ক্ষতির মুখে ফেলে। ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রতিরোধ আন্দোলন ইসরায়েলকে এমন বিপর্যয়ে ফেলে দিয়েছে, যেখানে আগের কোনো আরব সেনাবাহিনীও সফল হয়নি।
দুই লাখ টনের বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করেও ইসরায়েল প্রতিরোধ বাহিনীকে দমন করতে পারেনি। আলোচনার মাধ্যমে মাহমুদ আব্বাস ও অসলো প্রক্রিয়াকে পুনরায় তুলে ধরার পশ্চিমা চেষ্টা চললেও বাস্তবতা ভিন্ন। গাজার প্রতিরোধ এখন উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর কৌশলে পরিণত হয়েছে, যা গোটা অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত গাজার বিজয় হলো ফিলিস্তিনি জনগণের অবিচল মনোবল, ঐক্য এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিরোধের প্রতি তাদের অটল সমর্থনের এক গৌরবময় প্রমাণ ।
সবকিছু বিবেচনায় রেখে এটিও স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, গাজার বর্তমান যুদ্ধবিরতি কোনোভাবেই ‘শান্তিচুক্তি’ হিসেবে দেখা যাবে না; এটি কেবল গণহত্যার এক স্বল্প বিরতি। কারণ, নিশ্চিতভাবেই সামনে আরও এক দফা সংঘাত আসছে—যার প্রকৃতি নির্ভর করবে আগামী মাস ও বছরগুলোতে পশ্চিম তীর এবং গোটা অঞ্চলে কী ঘটে তার ওপর।
রামজি বারুদ, দ্য প্যালেস্টাইন ক্রনিকল-এর সম্পাদক। মিডলইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ মনজুরুল ইসলাম ১৫ অক্টোবর, দৈনিক প্রথম আলো