বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তার জন্য দায় কার? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে? ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক উত্থাপিত সাত দফা প্রস্তাব রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে কতটা কার্যকর হতে পারে? এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো কী?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে অংশগ্রহণকালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও অন্য সংখ্যালঘুদের নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনেও যোগ দেন। সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ড. ইউনূস রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে সাত দফা প্রস্তাব উত্থাপন করে রোহিঙ্গাদের দ্রুত রাখাইনে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মায়ানমার ও আরাকান আর্মির ওপর চাপ সৃষ্টিসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে চিরতরে এই সংকটের সমাধানের আহবান জানান। রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে তিনি প্রত্যাবাসনই সমস্যাটির একমাত্র শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধান বলে উল্লেখ করেন।
প্রধান উপদেষ্টার সাত দফা প্রস্তাব
১। রাখাইনে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করা।
২। মায়ানমার ও আরাকান আর্মির ওপর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং সম্প্রতি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা।
৩। রাখাইনে স্থিতিশীলতা আনতে আন্তর্জাতিক সহায়তার বন্দোবস্ত করা এবং তা পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক বেসামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
৪। রাখাইনের সমাজ ও শাসনব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের টেকসই অন্তর্ভুক্তির জন্য আস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া।
৫। যৌথ পরিকল্পনায় অর্থদাতাদের পূর্ণ সহায়তা নিশ্চিত করা।
৬। জবাবদিহি ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৭। মাদকের অর্থনীতি ধ্বংস করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন করা।
সংকট সমাধানে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রস্তাব: জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর লিখিত বক্তব্যে সংকট সমাধানে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানান। পদক্ষেপগুলো হলো-
* সব পক্ষকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা আইন ও মানবাধিকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা অগ্রাধিকারে রাখা;
* মায়ানমারে বাধাহীনভাবে মানবিক সহায়তা যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি এবং কোনো সম্প্রদায়কে খাবার, ওষুধ ও জীবনরক্ষাকারী সহায়তা থেকে বঞ্চিত না করা এবং
*জোরালো মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থায়ন করা, যা মৌলিক চাহিদা পূরণ, শরণার্থীদের পরনির্ভরশীলতা থেকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে এবং আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ কমানোর জন্য অপরিহার্য।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন যে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মায়ানমারের ভেতরেই রয়েছে। মায়ানমারের জনগণের জন্য ন্যায়সংগত, বাস্তব ও ভবিষ্যত্মখী নতুন অধ্যায় শুরুই রোহিঙ্গাদের দুর্দশার একমাত্র স্থায়ী সমাধান বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রোহিঙ্গাবিষয়ক সম্মেলনের আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখতে গিয়েও এই সংকট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কোনোভাবেই মায়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন যে বাংলাদেশ শুধু একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেশী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। তিনি তহবিল সংকট নিরসনে দাতাদের সাহায্য বাড়াতে এবং সম্ভাব্য নতুন দাতাদের অনুদান প্রদানের আহবান জানান।
রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ : এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি এবং জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিদের বক্তব্য থেকে রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়-
১। ওই সম্মেলনে জাতিসংঘ ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশসহ ২০টিরও বেশি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ইইউ এবং ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। মায়ানমারের সামরিক জান্তা কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত বেসামরিক সরকার এবং মায়ানমারের জাতীয় ঐক্য সরকারের প্রতিনিধিদেরও বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা মায়ানমারের সামরিক সরকারের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিল না। অথচ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনেকেই এসব দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের নিষ্ক্রিয় দর্শক ভাবলে ভুল করা হবে। মায়ানমারের সঙ্গে এসব দেশের নানা দিক থেকেই নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রতিবেশী দেশগুলোকে সম্পৃক্ত করেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের কথা চিন্তা করতে হবে।
২। জাতিসংঘ মহাসচিবের উল্লেখ করা তিনটি পদক্ষেপ মোটামুটিভাবে মানবিক সহায়তা নিয়েই কেন্দ্রীভূত। এমনকি তিনি মায়ানমারের অভ্যন্তরে বাধাহীনভাবে মানবিক সহায়তা যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টির কথা বলেছেন। কিন্তু সংকটের টেকসই সমাধান, বিশেষ করে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের মতো কোনো পদক্ষেপের কথা তিনি উচ্চারণ করেননি। হয়তো তিনি মনে করতে পারেন জাতিসংঘের পক্ষে মায়ানমারকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে সম্মত করানো সম্ভব হবে না।
৩। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের ভাষ্যমতে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মায়ানমারের ভেতরেই রয়েছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে সেটি করা হয় না কেন বা বাধা কোথায়? বাংলাদেশ তো সহযোগিতার হাত বাড়িয়েই আছে। আসলে এসব কথা বলা সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
৪। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের পক্ষে। অর্থাৎ যত দিন মায়ানমারের সেই অবস্থা বিরাজ না করবে তত দিন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে পাঠানো যাবে না। বাংলাদেশও তেমন প্রত্যাবাসন কামনা করে। কিন্তু মায়ানমারে তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করার দায়িত্ব কার? সেটি না করা গেলে রোহিঙ্গারা কি আজীবন বাংলাদেশেই থেকে যাবে? ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কি তার সদস্য দেশগুলোতে ভাগাভাগি করে এদের নিয়ে যেতে পারে না? তাদের তো বিদেশ থেকে কাজ করার জন্য অনেক লোক আনতে হয়।
৫। সম্মেলনের ইতিবাচক দিকটি হলো রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ছয় কোটি এবং যুক্তরাজ্যের তিন কোটি ৬০ লাখ ডলার সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা। নিঃসন্দেহে তা বিদ্যমান তহবিল সংকটের সুরাহা ঘটাবে।
রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির শুরু থেকেই বাংলাদেশ প্রতিবছর জাতিসংঘে সংকট সমাধানের জন্য আবেদন জানিয়ে আসছে, কিন্তু কিছুই ঘটেনি। দুবার তারিখ নির্ধারণ করেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। আমাদের এবং মায়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলোকে, বিশেষ করে চীন ও ভারতকে সম্পৃক্ত করা গেলে প্রত্যাবাসন সম্ভব হতেও পারে।
এ কে এম আতিকুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব ১৫ অক্টোবর, দৈনিক কালের কণ্ঠ