পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘাতের মূল উৎস কী এবং কীভাবে টিটিপি এই সংঘাতকে গভীরতর করেছে? ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার ফলে পাকিস্তান কী ধরনের কূটনৈতিক চাপে পড়েছে? ভবিষ্যতে তালেবান-টিটিপি- পাকিস্তান সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় কোন ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে? এর সম্ভাব্য রূপ কেমন হতে পারে? বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে পাকিস্তান-আফগান-টিটিপি সংকট কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?
রাজনীতি অনেক সময় বন্ধুত্ব ও শত্রুতার মেরুকরণ বিস্ময়করভাবে বদলে দেয়। ভূরাজনীতির বেলায়ও সে রকম ঘটে। তবে পাকিস্তানের শাসকদের জন্য আফগান তালেবান সরকারের আচরণ অনেকটাই ট্র্যাজেডির মতো। অচিন্তনীয় এক দুর্বিপাকও বলা যায় একে। কেন এমন হলো? পেছনে ফিরে তাকালে কী দেখি আমরা? এর ভবিষ্যৎ পরিণতি কী?
সাম্প্রতিক সংঘাত: সীমান্তে উত্তেজনা ও দ্বন্দ্বের বিস্তার
সম্প্রতি ডুরান্ড লাইনের দুই পাশে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে কয়েক দফা বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষ হয়। মূল ঘটনার সূত্রপাত পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে, যার লক্ষ্য ছিল টিটিপির নেতা নুর ওয়ালি মেসুদকে হত্যা করা। এর প্রতিক্রিয়ায় আফগান তালেবান যোদ্ধারা পাকিস্তানের একাধিক সীমান্তচৌকিতে হামলা চালায়, যাতে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সৌদি আরব ও কাতারকে মধ্যস্থতার জন্য এগিয়ে আসতে হয়। কিন্তু সাময়িক বিরতি ঘটলেও উত্তেজনা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের পারদ কমেনি। একই সময়ে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নয়াদিল্লি সফর এবং ভারতের কাবুলে কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চালুর ঘোষণা পাকিস্তানের জন্য এক কূটনৈতিক লজ্জা ও সংকেতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সংঘাতের মূল কারণ: টিটিপি ও পশতু জাতীয়তাবাদ
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার বর্তমান বৈরিতার মূল কারণ হলো তেহরিক-ই- তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। ২০২১ সালে কাবুলে তালেবান সরকার গঠনের পরপরই পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় টিটিপি সক্রিয় হয়ে ওঠে। পাকিস্তান বর্তমানে দুটি ফ্রন্টে গেরিলা যুদ্ধের মুখোমুখি— একদিকে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী, অন্যদিকে পশতু টিটিপি। কেবল ২০২৪ সালেই এই সংঘাতে প্রায় আড়াই হাজারের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার টিটিপিকে নিরাপদ আশ্রয় ও আদর্শিক সমর্থন দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
যেখানে শুরু সেই ভুল: ১৯৭৯ সালের প্রক্সি যুদ্ধ পাকিস্তান যে সংকটে পড়েছে তার শুরু ১৯৭৯ সালে, যখন সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হয় আফগান প্রতিরোধ যুদ্ধ, যাতে পাকিস্তান ছিল অন্যতম প্রধান সহযোগী। জেনারেল জিয়াউল হকের নেতৃত্বে পাকিস্তান আফগান মুজাহিদ ও পরে তালেবান গঠনে নেতৃত্ব দেয়। এই প্রকল্পে যুক্ত ছিল সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রও। পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানে একটি বন্ধুভাবাপন্ন সরকার প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের কৌশলগত গভীরতা বাড়ানো।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই প্রকল্প আফগানিস্তানে আধুনিকতা ও স্থিতিশীলতার বিকাশ না ঘটিয়ে, বরং পাকিস্তানেই ধর্মভিত্তিক উগ্র মতাদর্শের বিস্তার ঘটিয়েছে। নিজেদের গড়া শক্তিই এখন তাদের জন্য অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া: ভারত, চীন ও ইরানের উদ্বেগ
তালেবানদের কৌশলগত জোট গঠনের মাধ্যমে পাকিস্তান, চীন, ইরান এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকেও চাপের মুখে ফেলেছে। আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর এবং নয়াদিল্লির কাবুলে পুনরায় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করা তালেবানদের কৌশলী পদক্ষেপ। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে এসেছে যে, ভারত বেলুচ বিদ্রোহীদের মদদ দেয়। এখন ভারতের কাবুলে সক্রিয়তা বেলুচদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবেও কাজ করতে পারে। এটি চীনের জন্যও বিপদের কারণ। কারণ, চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে বেলুচিস্তানে, বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC)-এ। একইভাবে, ইরানের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা, যা আফগান ভূখণ্ডে ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতির কারণে ইরানের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
একটি বিকল্প সম্ভাবনা যা হারিয়ে গেছে
যদি পাকিস্তান ১৯৭৯ সালে আফগানদের অস্ত্র ও উগ্রবাদ না দিয়ে, বরং তাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের আধুনিকীকরণে বিনিয়োগ করত, তাহলে আজ হয়তো একটি শিক্ষিত, শান্তিপূর্ণ ও বন্ধুভাবাপন্ন আফগানিস্তান গড়ে উঠত। যেমনটি দেখা যায় মধ্য এশিয়ার মুসলিমপ্রধান দেশগুলো– তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান— যেগুলো এখন শিক্ষিত, শান্তিপূর্ণ ও প্রতিবেশী রাশিয়ার জন্য উদ্বেগহীন।
বর্তমানে আফগানিস্তানে সাক্ষরতার হার মাত্র ৩৭ শতাংশ, নারীরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র থেকে বঞ্চিত। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে একটি দক্ষ ও উন্নত জনবল সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এই ব্যর্থতার দায় পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদেরও নিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য বার্তা ও সম্ভাব্য হুমকি
বাংলাদেশ সরাসরি এই সংকটের কেন্দ্রে না থাকলেও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে যে, বাংলাদেশের নাগরিকরাও টিটিপির সঙ্গে জড়িয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। আফগান-ভারত সম্পর্কোন্নতি এই প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্যও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাকিস্তান যে সংকটে পড়েছে, তা তার দীর্ঘদিনের এক আত্মঘাতী কৌশলের পরিণতি। তালেবানকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে পাকিস্তান আজ নিজেই তালেবানি ভাবধারার দ্বারা আক্রান্ত। সেইসঙ্গে ভূরাজনীতিতে ভারত, চীন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র— সকলকে নতুনভাবে কৌশল সাজাতে বাধ্য করছে তালেবান সরকার।
এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কেবল সামরিক নয়, একটি বিস্তৃত সামাজিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় তালেবান-টিটিপি- পাকিস্তান সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও বিপদের ইঙ্গিত দিয়ে যেতে পারে।
আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস গবেষক ১৬ অক্টোবর, প্রথম আলো