আমি এ পর্যন্ত চাকরির ভাইভা দিয়েছি তিনটি। বিবি এডি, ৪৪তম বিসিএস আর ৪৫তম বিসিএস। তিনটি ভাইভাতেই আমি মহান আল্লাহর কৃপায় সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি।
ভাইভার ক্ষেত্রে পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান সাদিক স্যারের একটা কথা সিনিয়রদের মুখে প্রায়শই শুনতাম। তিনি বলতেন `Take it(viva) as a Game’.।
আমি যদিও গেইম হিসেবে ভাইভাকে কখনোই নিতে পারিনি। ভাইভার দিন সকালে কিছু খাইতে পারতাম না ভয়ে। ধরা চলে শুধু কেক কলা খেয়ে তিনটা ভাইভাতেই অংশ নিয়েছি। তবে বোর্ডে উপস্থিতির সাথে সাথেই আমি আমার আমিতে প্রবেশ করি।
৪৪তম বিসিএসে পুলিশে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর ৪৫তম তে এটেন্ড করা নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলাম। সে কারণে প্রিপারেশানও ততটা জোর দিয়ে নেয়া হয়নি। পুরোপুরি পেপার বেইজড আর পুরনো কিছু বই থেকে ঘষামাজা করে নতুন মোড়কে পুরনো সন্দেশ সাজিয়ে বোর্ডে উপস্থিত হয়েছি।
আমি চেষ্টা করেছি প্রতিটি ভাইভাতে খোলামেলা থাকতে। ডিপ্লোমেটিক কথাবার্তা আমি পারি না, এ কারণেই সম্ভবত ভাইভা মানেই আমার কাছে হাসি ঠাট্টা আর গল্পের ছলে আলাপ আলোচনা বলা চলে।
৪৫তম বিসিএসে আমার ভাইভা ছিলো বিজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক আমজাদ হোসেন স্যারের বোর্ডে। স্যার একজন দিলখোলা অমায়িক মানুষ। পিউর জেন্টলম্যান যাকে বলে। এক্সটার্নাল ছিলেন দু’জন ম্যাম।
আমার সিরিয়াল ছিলো ১৫ জনের মধ্যে একদম শেষে। প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে ভাইভা শুরু হয়। যথারীতি সারাদিন না খেয়ে থাকার কারণে টায়্যার্ডনেস শরীর মনে ভর করে বসে।
কলিং বেল বাজার সাথে সাথে আসতে পারি বলে রুমে প্রবেশ করে আস্তে করে দরজা ভেজাই। পরে সম্মুখে অল্প অগ্রসর হয়ে সালাম দেই।
বোর্ড সালাম নেন এবং চেয়ারম্যান স্যার আমাকে বসতে বলেন।
তারপর শুরু মেইন গেইম-
চেয়ারম্যান স্যার- দুঃখিত জনাব শাহিন আলম, আপনাকে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হলো। ওদের(অফিস সহায়কদের) বলছিলাম নাস্তা দিতে আপনাদেরকে।
আমি- জ্বি স্যার, দিয়েছিলো। অসংখ্য ধন্যবাদ ।
চেয়ারম্যান স্যারঃ- Okay, Mr Shahin, Introduce Yourself?
আমি:- (ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে নিজেকে যথাসম্ভব গুছিয়ে উপস্থাপন করেছি। ফোকাস করেছি নিজ জেলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ডিসিপ্লিন, জোর দিয়েছি ৪৪তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্তি আর বর্তমান কর্মস্থল বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি।)
চেয়ারম্যান স্যারঃ- আপনার এবারের প্রথম চয়েস কী?
আমিঃ- বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার, স্যার।
চেয়ারম্যান স্যারঃ- আপনি বাংলাদেশ ব্যাংকে অনেক ভালো পোস্টে আছেন, আবার ৪৪ এ পুলিশে সুপারিশপ্রাপ্ত। পুলিশ অনেকে ফার্স্ট চয়েসে রেখে ভাইভা দিচ্ছে। আপনি চেইঞ্জ কেন করতে চাচ্ছেন?
আমিঃ- (এই প্রশ্ন আমাকে করা হবে আমি জানতাম, উত্তর দিতে গিয়ে চেষ্টা করেছি প্রাপ্ত ক্যাডারকে যথাসম্ভব মর্যাদায় রেখে নতুন চাওয়ার প্রতি আমার অতি আগ্রহকে।)
তারপর চেয়ারম্যান স্যার ফ্লোর দেন এক্সটার্নাল ম্যাডামদেরকে।
এক্স-১ ম্যাম সাহিত্যানুরাগী, আমিও তাই। প্রথমেই তিনি প্রশ্ন করেন হেমলক কী, চিনি কি-না?
সারাদিনের ক্লান্তিতে পুরো শরীরের অংশ হিসেবে কান দু’টিও টায়ার্ড ছিলো আমার। যেকারণে ম্যামের হেমলক কে আমি শুনি হ্যামলেট!
এবং হ্যামলেট যে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের একটি ট্রাজেডি সে বিষয়ে জ্ঞান ফলানোও শুরু করি।
এক্স-১ ম্যাম কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মাঝপথে আমাকে থামিয়ে বলেন, are you sure?
তখন নাট্যমঞ্চে আসেন এক্স-২ ম্যাম। তিনি বলেন আপনার ভুল হচ্ছে, ম্যাম আপনার থেকে হেমলক সম্বন্ধে জানতে চেয়েছেন!
স্যরি বলে আবার হেমলক আর দার্শনিক সক্রেটিসের বিয়োগান্তক শনি-কাহিনী সংক্ষেপে বলি।
এক্স-১ঃ- পড়াশোনা, জব এসবের বাইরে কী করেন?
আমিঃ- আমি বই পড়ি স্যার।
এক্স-১ঃ সর্বশেষ কোন বই পড়েছেন?
আমিঃ-স্যার আমি নবনীতা দেব সেনের “ট্রাকবাহনে ম্যাকমাহনে” বইটা পড়েছি।
তারপর উনি রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, জীবনানন্দ পড়া হয় কি-না জানতে চান এবং শেষের কবিতার নামকরণসহ চরিত্রায়ন সম্পর্কে জানতে চান।
(ইতোমধ্যে আবিষ্কার করি চেয়ারম্যান স্যারও বই পড়েন। বই বলতে উনি কাব্যপ্রেমী। এক্স-১ স্যার আমাকে শেক্সপিয়ারের কয়েকটি উক্তি কোট করতে বলেন, আমি সম্ভবত ২-৩টা করি। মাথায় আর ছিলো না।
চেয়ারম্যান স্যার বেশ কিছু কবিতার লাইন কোট করে জিজ্ঞাসা করেন, কার জানি কি-না?
কবিতা আমি পড়ি না, তাই উত্তরও পারি নাই। উনার কোটেশানগুলো সম্ভবত শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর রবীন্দ্রনাথের ছিলো(পরে আন্দাজ করি)।
এক্স-২ স্যার কয়েকটা প্রশ্ন করেন। তাঁর প্রশ্নগুলো ছিলো:
প্রশাসন ক্যাডারের পদসোপান?
আমার প্রথম নিয়োগ কোন পদে হবে?
ইউএনও হিসেবে আমার দায়িত্ব কী কী?
এত এত দুর্নীতি হচ্ছে কেন?
দুর্নীতি যাতে না হয় কী কী উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে?
আপনি ট্রান্সপারেন্সি, ইন্ট্রেগ্রিটির কথা বলছেন। আমরা এসবে ইতোমধ্যে ফলো আপে আছি। তারপরও পত্রিকা খুললে দুর্নীতির এত ফিরিস্তি আসছে কেন?
উত্তরে আমি আমাদের ন্যাশনাল এথিকস, ন্যাশনাল ট্রাস্টের ঘাটতি আর শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিতে আলোকপাত করে সমাপ্তি টানি।
.
চেয়ারম্যান স্যার সিঙ্গাপুরের উন্নতির প্রসঙ্গ টেনে জানতে চান এর কারিগর কে?
সিঙ্গাপুরের উন্নতির মূল কারিগর ছিলেন লি কুয়ান। লি কুয়ান ছিলেন স্বৈরাচারী এবং তার আমলে অনেক দুর্নীতি হয়েছে দেশটিতে।
স্যারের প্রশ্ন ছিলো সিঙ্গাপুর তো অনেক অনেক উন্নতি করছে লি কুয়ানের আমলে। শোনা যায় লি কুয়ান স্বৈরাচারী ছিলেন।
আপনি কী মনে করেন দেশের উন্নতির স্বার্থে লি কুয়ানদের দরকার আছে কি-না?
আমার উত্তর ছিলো- স্যার, আমি সাফাই গাইবো না।
ভাইভা শেষ। আমার পেপারস নিতে বলেন এবং শুভকামনা জানান। আমি সালাম দিয়ে বের হই।
ভাইভা হয়েছিলো ১২ মিনিটের মতন। চেয়ারম্যান স্যার প্রায় প্রশ্নের উত্তরে কিছু করে এড করেছেন। এক্স-১ ও এক্স-২ ম্যাম আরও কিছু প্রশ্ন করেছিলেন, এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না।
(৪৪তম বিসিএস ছিলো আমার সেরা রিটেন দেয়া বিসিএস। এপিয়ার্ড দিয়ে অংশ নেই। টেকনিক্যালে শুধু এটেন্ড করে আমি বোথে পাশ করি। বলা চলে ভালোই মার্ক ছিলো। ফলাফল প্রথম চয়েস পুলিশ পাই।
৪৫ রিটেনও ভালো হয়েছিলো তবে ৪৪ এর তুলনায় কম।
দুই ভাইভাতেই বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক হিসেবে থাকার দরুন বিশাল ফেভার পেয়েছি আমি। এ জন্য আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি কৃতজ্ঞ। স্যাররা শেষে অফ বোর্ডে দুই বারই আমাকে বলেছেন আপনি যেখানে আছেন অনেক ভালো আছেন। কার লোন, হাউজ লোন, ইনক্রিমেন্ট, প্রমোশন সব আছে আপনাদের, তারপরও কেন বিসিএসে ঝুকছেন?
এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি গৎবাঁধা করে। ব্যাংকে কাজের বৈচিত্র্য নেই, সিভিল সার্ভিসে আছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
বোর্ড বেশ কিছু প্রশ্ন ইংরেজিতে করে। আমি বাংলায় বলার সদয় অনুমতি চাই, বোর্ড নিশ্চিত করে।
যাহোক। ভাইভা প্রার্থীদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে বোর্ডে কোনক্রমেই বেয়াদবি করা যাবে না, কোন প্রশ্নের উত্তর না পারলে বিনয়ের সাথে অপারগতা জানাতে কার্পণ্য করা যাবে না, টু দ্য পয়েন্ট আন্সার করতে হবে আর অতিরিক্ত পাণ্ডিত্য দেখানো যাবে না।
বুকলিস্ট, স্ট্রাটেজি ইত্যাদি বিষয়ে আমি চেষ্টা করবো লিখতে।
অর্জিত পরিচয়-
মোঃ শাহিন আলম
সহকারী পরিচালক(জেনারেল), বাংলাদেশ ব্যাংক।
এএসপি(সুপারিশপ্রাপ্ত), বাংলাদেশ পুলিশ (৪৪তম বিসিএস)
সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট(সুপারিশপ্রাপ্ত), ৪৫তম বিসিএস।