বাণিজ্যযুদ্ধ হচ্ছে দুটি দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব। একটি দেশের অন্যায্য বাণিজ্যিক কার্যকলাপের প্রতিশোধ বা কোনো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করতে আমদানির ওপর শুরু ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মাধ্যমে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কোনো একটি দেশ অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে বা শত্রুরাষ্ট্রের অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে কোনো একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধের সূচনা করতে পারে। বিশ্বের ওপর চীনের প্রভাব প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশটি একটি সুপার পাওয়ার হয়ে উঠেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। চীন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ পণ্য সরবরাহকারী রাষ্ট্র। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানি পণ্যের ১৬ শতাংশ চীন থেকে এসেছে। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র চীনের উত্থান সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে চীনা পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ১৪৫ শতাংশ শুল্কারোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এটা কার্যত চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো। চীন পাল্টা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর ১২৫ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছিল। এর মাধ্যমে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র রূপ পরিগ্রহ করেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন এখন শুল্ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে এবং এর ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র অনেক দেশের ওপর নতুন শুল্কারোপ ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করে। বেইজিং বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অস্বাভাবিক উচ্চ শুল্ক আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক বাণিজ্যনীতি, মৌলিক অর্থনৈতিক আইন এবং সাধারণ বিচার-বিবেচনার গুরুতর লঙ্ঘন করেছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে স্বপ্রণোদিত মন্দা ও সরকার ব্যবস্থা ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন ।
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা
চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সুইজারল্যান্ডের জেনেভোয় বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ দুটির প্রতিনিধিদের মধ্যে সপ্তাহব্যাপী আলোচনা হয়। ১২ মে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সমঝোতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে ৯০ দিনের বিরতি দেওয়া হয়েছে। যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী- –
> ১৪ মে থেকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের পণ্যে আরোপিত ১৪৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ৩০ শতাংশে নিয়ে আসবে ।
>চীনও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক ১২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনবে।
>উভয় পক্ষ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চলমান রাখতে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে একমত হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুরোপুরি বিপযুক্ত এমন কথা এখনই বলা যাবে না। মন্দার ঝুঁকি রয়ে গেছে এখনো, যদিও অর্থনৈতিক পতনের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।
বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের পণ্যের ওপর অক্টারোপ করলেও এর প্রভাব পড়েছিল বিশ্ব বাণিজ্যে। এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে আরও অনেক রাষ্ট্র এতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আমদানি শুল্ক হচ্ছে ট্রাম্পের কৌশলগত অস্ত্র। তবে এই অস্ত্রের প্রভাব আন্তর্জাতিক সুকৌশলগত রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী। নিসন্দেহে দুই দেশের এক সম্পর্কিত ঘোষণাগুলোর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে অর্থ বাজারগুলোতে।
শুল্ক সম্পর্কিত ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর সমগ্র বিশ্বের শেয়ারবাজারে একযোগে ধস নামে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, ট্রাম্পের মধ্য দিয়ে তা অবসানের পথ প্রশস্ত হয়েছে বলেই মনে করা। নীতির
পাশাপাশি বৈশ্বিক মন্দারও আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যতে নতুন
শুল্কারোপের সিদ্ধান্তকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ছিল বড় আঘাত। বাণিজ্যযুদ্ধে যেহেতু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, তাই শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ জনগণ। দাম বৃদ্ধি পেলে ক্রেতারা কম কিনবেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি কমবে।
সার্বিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে চলেছে। অবাধ বাণিজ্য উন্নয়ন
বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। কারণ উচ্চতঙ্ক বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বাণিজ্য পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদি হলে তা
বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতিকে ধীর করবে এবং এর ফলে বৈশ্বিক কর্মস মাত্রায় রপ্তানি করে এমন রাষ্ট্রগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে
মার্কিন শুল্কের প্রভাব কিছুটা লাঘব করতে বিকল্প বাণিজ্য অংশীদার খুঁজছে চীন। কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানিকে খরচে করে ভুলে শুল্ক। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক চীনের উৎপাদন খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। গত এপ্রিল মাসে চীনের কারখানার উৎপাদন গত ১৬ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকুচিত হয়েছে। ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশনের মতে, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি অন্তত ২০ শতাংশ কমবে। আর চীন থেকে আমদানি আরও বেশি হারে কমবে।
বিশ্বায়ন ব্যবস্থায় প্রভাব
বিশ্বায়ন হলো এক রাষ্ট্রের ওপর অন্য রাষ্ট্রের নির্ভরশীলতা। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য হলো সেটা আঞ্চলিক নির্ভরশীলতা। আর এশিয়ার কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য হলে সেটাকে বলে বিশ্বায়ন। বিশ্বায়নকে একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া বলা যায়; যার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র ও অ-রাষ্ট্রীয় কারক নিজেদের মধ্যে বহুমাত্রিক ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে। আর অ-রাষ্ট্রীয় কারক বলতে বহুজাতিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত বু সংগঠনগুলোকে বোঝায়। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতা, সংস্কৃতি, বাজার, রাজনীতি মূল্যবোধ, আদর্শ, নাগরিকতার মতো বুনিয়াদি ধারণাকে জাতিরাষ্ট্র নামক ভৌগোলিক পরিপ্রেক্ষি থেকে মুক্ত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ, পরিষেবা, পুঁজি প্রযুক্তি, তথ্যের ও ধারণার উন্মুক্ত প্রবাহ ও প্রভাব বিশ্বায়নের প্রাথমিক শর্ত। বিশ্বায়ন আবার বিভি দেশের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন। বিশ্বায়ন যেমন একদিকে রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে, একইসঙ্গে রাষ্ট্র বিশ্বায়নের প্রভাব বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণ ও সীমিত রাখার বিষয়ে উদ্যোগী হতে বাধ্য হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্ত হতে অনেক বৃহৎ দেশ বিশ্বায়নবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছে। চীনের ওপর শুল্ক বসিয়ে ট্রাম্প এই নির্ভরশীলতা কমানোর পক্ষে। স্নায়ুযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও অভিবাসন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ শুল্ক ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। ট্রাম্প মনে করেন, বিশ্বায়নই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শিল্প ও কর্মসংস্থান হারানোর জন্য দায়ী। বিশ্বায়নের কারণে চীনে সকল কারখানা চলে যাওয়ায় মার্কিন নাগরিকরা কাজ পাচ্ছেন না। তাই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যারা বিনিয়োগ করবেন, তাদের বিশেষ ছাড় প্রদানের কথা বলেছিলেন তিনি।
চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাস চরমে পৌঁছেছে। তবে পরিশেষে উভয় দেশ প্রাথমিকভাবে ৯০ দিনের জন্য শুল্ক অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সম্মত হওয়ায় বিশ্ববাজারে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে ।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চীনের সঙ্গে তিনি ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যযুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী। ট্রাম্প এ প্রসঙ্গে বলেন, চীনের সঙ্গে চুক্তি করতে পারলে ভালো লাগবে। তবে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যদি চুক্তি না করা হয়, তাহলে ৯০ দিনের বিরতির পর উচ্চতর আবারও বলবৎ করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ কারও জন্যই সুফল বয়ে আনবে না । এতে অর্থনীতির প্রবাহ ব্যাহত হয়, এই যুদ্ধে শেষমেশ কেউ জিতে না।
ড. মো. মোরশেদুল আলম,সহযোগী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশকাল: ১৩ জুন, দৈনিক জনকণ্ঠ।