ভূমিকা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভরতা, আত্মমর্যাদা এবং বৈদেশিক নীতিনির্ধারণে পূর্ণ স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে, স্বাধীন রাষ্ট্রনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই নীতির ভিত্তিতেই ঘোষণা করেছিলেন ‘কোনো রাষ্ট্র আমাদের শত্রু নয়, সবাই আমাদের বন্ধু।’ এই নীতি কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অংশ ছিল না, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আরেক রাষ্ট্রনায়ক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন ‘আমরা সবাইকেই বন্ধু হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু কেউ যদি আমাদের বন্ধুর বেশে প্রভু হতে চায়, সেটা আমরা কখনো মেনে নেব না, মানতে দেব না।’ এই বক্তব্য বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তাকে রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটি প্রায়শই বন্ধুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের পরিবর্তে একতরফা নির্ভরশীলতার রূপ নিয়েছিল।
প্রতিবেশীদেশের সাথে সম্পর্কের ভিত্তি
প্রতিবেশী দেশটিও আমাদের তাদের গোলামের মতো ভাবত। ব্যবহার করত ক্রীতদাসের মতোই। আমাদের তখনকার রাষ্ট্রপ্রধানও সেই সুযোগ করে দিয়েছিলেন, ক্ষমতার গদি পোক্ত করার জন্য। যা দেশের প্রতিটি মানুষই বুঝতে পেরেছিল। এর ফলেই ২০২৪-এর আন্দোলনে স্লোগান হয়েছিল দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা-ঢাকা। ফলে বিদায় নিতে হয়েছে প্রভুদেশ ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট আওয়ামী সরকারকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতার নীতি (principle of sovereign equality) জাতিসংঘ সনদে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত। সেখানে বলা হয়েছে, বড় রাষ্ট্র ও ছোট রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক হবে সমঅধিকার ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বন্ধুত্বের রূপ নিতে চায়, তবে সেই সম্পর্ককে অবশ্যই এই আন্তর্জাতিক নীতির ভিত্তিতে দাঁড়াতে হবে। কর্তৃত্ববাদের স্থান এখানে দেওয়া যাবে না ।
একমুখী সুবিধার দিকে ঝুঁকানো
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অনন্য। ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ চারদিক থেকে ভারতের দ্বারা বেষ্টিত। এই অবস্থান আমাদের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তেমনি সুযোগও সৃষ্টি করেছে। সীমান্ত বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, নৌপথ ব্যবহার, সাংস্কৃতিক বিনিময় এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সম্পর্ক দুই দেশের জনগণের জন্য কল্যাণকর হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সম্পর্ক একমুখী সুবিধার দিকে ঝুঁকে গেছে। একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার সঠিক রূপরেখা নির্ধারণ না হলে দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শুল্ক ও অশুল্ক বাধা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, কৃষিজাত পণ্য কিংবা ওষুধ ভারতের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা অশুল্ক বাধা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। অথচ বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার জন্য ন্যায্য বাজার প্রবেশাধিকার দেওয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনের মৌলিক শর্তা ভারত যদি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের বন্ধু হতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই এই বৈষম্য দূর করতে হবে। কারণ ন্যায্য বাণিজ্য ছাড়া কোনো বন্ধুত্বই স্থায়ী হয় না। সম্ভবত এটি উপলব্ধি করার সময় এসেছে।
ভারতের বাজার বাংলাদেশে উন্মুক্ত থাকলেও, বাংলাদেশি পণ্য ভারতীয় বাজারে নানা রকম শুল্ক. অশুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার বাধার মুখে রয়েছে। তাছাড়া যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান আজও হয়নি। বিশেষ করে তিস্তার পানিবণ্টন প্রশ্নে বাংলাদেশ বারবার প্রতিশ্রুতি পেলেও বাস্তবায়ন দেখেনি। একে ভারত তাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেই যাচ্ছে।
সীমান্ত নদীর পানি ব্যবহার
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নদী একটি আন্তঃসীমান্ত সম্পদ। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ জলসম্পদ আইন (UN Convention on the Law of the Non Navigational Uses of International Watercourses) স্পষ্টভাবে বলে, সীমান্ত নদীর পানি ব্যবহার হবে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে। কিন্তু ভারত এই আন্তর্জাতিক আইনকে কার্যত অগ্রাহ্য করছে। এর ফলে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন্ধুত্বের নামে যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হয়, তবে সেটি আর বন্ধুত্ব নয়, বরং আধিপত্য বিস্তারের নামান্তর ।
নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আরেকটি বড় মাত্রা হলো নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, এখানে যে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা পুরো অঞ্চলের ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রায়ই ভারতের নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার হওয়ার অভিযোগের মুখে পড়ে। সীমান্তে বেড়া নির্মাণ, সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়নে বিলম্ব, কিংবা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সংকট মোকাবিলায় ব্যবহার করা এসব বাস্তবতা আমাদের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
পারস্পরিক সম্মান ও আস্থা
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন করা যায় না। ফলে, নিরাপত্তা সহযোগিতা অবশ্যই হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে। একইভাবে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের জনগণের মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভিয়েনা কনভেনশনের আলোকে শান্তিকালে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা স্পষ্টতই বেআইনি। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা কার্যত স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সীমান্তে এ-রকম রক্তপাত চলতে পারে না। একটি প্রকৃত সমতার সম্পর্ক হলে এ ধরনের ঘটনা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হতো ।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেমন হওয়া দরকার
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ভারতের অস্বাভাবিক প্রভাবও নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না (principle of non-intervention, UN Charter Article 2 (7). কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগজনক । এখন প্রশ্ন আসে তাহলে কেমন হওয়া উচিত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক?
প্রথমত, এই সম্পর্ক হতে হবে পরিপূর্ণ সমতার ভিত্তিতে। বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকে বুঝতে হবে, বন্ধুত্ব মানে প্রভুত্ব নয়। বাংলাদেশের স্বার্থকে অবহেলা করে, কেবল নিজেদের কৌশলগত প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে যদি সম্পর্ক পরিচালিত হয়, তবে সেই সম্পর্ক স্থায়ী হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক লাভ। আমাদের দেখতে হবে বাংলাদেশ ভারতের জন্য ভৌগোলিকভাবে এক বিশাল কৌশলগত সেতুবন্ধন। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
কিন্তু এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে ন্যায্য প্রাপ্তি দিতে হবে। পানিবণ্টন, বাণিজ্য সুবিধা, জ্বালানি সহযোগিতা এসব ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক গভীর। এই সম্পর্ক রাজনৈতিক লাভের জন্য নয়, বরং জনগণের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করা উচিত। সীমান্ত হত্যা বন্ধ, সহজ ভিসা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এসব পদক্ষেপ দুই দেশের জনগণের বন্ধনকে দৃঢ় করবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়করা যেমন বলেছিলেন আমরা কারও শত্রু নই, তবে কারও প্রভুত্বও মেনে নেব না। এই নীতিই হওয়া উচিত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূল দর্শন।
বন্ধুত্ব তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তা পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়বিচার এবং সমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। বর্তমান বিশ্বে ছোট-বড় সব রাষ্ট্রই বৈশ্বিক পরিসরে কূটনৈতিক অবস্থান শক্ত করার জন্য কাজ করছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের কূটনৈতিক সক্ষমতা তখনই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, যখন আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারব।
ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশের বন্ধু হতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে হবে এবং পারস্পরিক সম্পর্কের সব ক্ষেত্রে ন্যায্যতা বজায় রাখতে হবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সমতা ও সম্মানের ওপর। একটি দেশের একতরফা স্বার্থের ভিত্তিতে নয়, বরং ন্যায়সংগত পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই এ সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে।
উপসংহার বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষিত নীতি আজও সমান প্রাসঙ্গিক বন্ধু হিসেবে সবাইকে স্বাগত, কিন্তু কারও প্রভুত্ব নয়। এটাই হওয়া উচিত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথচলা। ধারণা করি, ভারত তার পররাষ্ট্রনীতিকে নিয়ে আমূল পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হবে। সেটি কোন ধারায় স্পষ্ট হবে, তা আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই হয়তো টের পাব। সম্ভবত বিষয়টি আমাদের জন্য সুখকর হবে।
২০ আগস্ট ২০২৫। শাহেদ শফিক, লন্ডন থেকে লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সূত্র: দেশরূপাত্তর।