আট দশকে জাতিসংঘের সাফল্য ও ব্যর্থতার নিরিখে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা আলোচনা করুন। ।
প্রতিবছর ২৪ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে তানুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছিল জাতিসংঘ সনদ, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে জন্ম নেওয়া এ আন্তর্জাতিক সংস্থাটির মূল ভিত্তি। এ দিবসটি কেবল এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বরং বিশ্বশান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষায় এর কাজের মূল্যায়ন এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এর সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্ব নিয়ে আত্মসমালোচনারও দিন। জাতিসংঘের উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, জাতিগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অর্জন এবং জাতিগুলোর কর্মকাণ্ডকে সমন্বয় করার কেন্দ্র হিসাবে কাজ করা। এই মহৎ উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে সংস্থাটি বিভিন্ন অঙ্গ ও বিশেষায়িত সংস্থার মাধ্যমে বহুবিধ কাজ করে থাকে।
জাতিসংঘের বহুমুখী কাজ ও অর্জন
শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা: জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, সংঘাত নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি বহু স্থানীয় সংঘাতকে বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হওয়া থেকে রুখে দিয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন মূল সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশসহ বহু দেশ এ মিশনে নিয়মিতভাবে সৈন্য ও পুলিশ পাঠিয়ে বিশ্বশান্তিতে অবদান রাখছে। আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সংস্থাটি মধ্যস্থতা ও আলোচনায় সহায়তা করে।
মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা: মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র প্রণয়ন ছিল জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান অর্জন। বিশ্বের যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, সেখানেই। জাতিসংঘ তার বিশেষ প্রতিনিধি ও সংস্থাগুলোর মাধ্যমে আওয়াজ তোলে। সংঘাত, দুর্ভিক্ষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের কাছে খাদা, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা-যেমন, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি ও ইউএনএইচসিআর। এসব সংস্থা লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
উন্নয়ন ও দারিদ্র্যবিমোচন: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন জাতিসংঘের বর্তমান কাজের একটি কেন্দ্রীয় অংশ। বিশ্বজুড়ে চরম দারিদ্র্য হ্রাস, ক্ষুধা নিবারণ, সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংস্থাটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা ও অনুপ্রাণিত করে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনেস্কোর মতো বিশেষায়িত সংস্থাগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করে।
আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার: আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন ও সংরক্ষণে জাতিসংঘ এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসাবে কাজ করে।
সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্বের কঠিন বাস্তবতা: জাতিসংঘের এত বিশাল কর্মপরিধি সত্ত্বেও সংস্থাটির সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এর কাঠামোগত দুর্বলতা ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে এর অসহায়ত্ব। জাতিসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর অঙ্গ হলো নিরাপত্তা পরিষদ।
জাতিসংঘের ৮০ বছর
শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এ পরিষদের হাতে। কিন্তু এর পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া) ভেটো ক্ষমতা সংস্থাটির কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে। যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংকটে এ পাঁচ শক্তির জাতীয় স্বার্থ জড়িয়ে যায়, তখনই ভেটোর প্রয়োগ বা হুমকির কারণে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। সিরিয়া, ইউক্রেন, ফিলিস্তিন বা মিয়ানমারের মতো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ অক্ষমতা বারবার স্পষ্ট হয়েছে। স্থায়ী সদস্যদের স্বার্থের সংঘাতে জাতিসংঘ প্রায়ই একটি ‘উদ্বেগ প্রকাশকারী’ সংস্থায় পরিণত হয়, যা অসহায়ত্বেরই নামান্তর।
ড. শাহ জে মিয়া, প্রফেসর, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়; ১০ ফেব্রুয়ারি, দৈনিক যুগান্তর
রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রাধান্য: জাতিসংঘ কোনো বিশ্ব সরকার নয়; এটি সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর একটি সম্মেলন। কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা এর নেই, যদি না নিরাপত্তা পরিষদ তাতে অনুমোদন দেয়। ফলে, যখন কোনো সরকার নিজ দেশের জনগণের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায় (যেমন, গণহত্যা বা ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন), তখন জাতিসংঘ চাইলেও সার্বভৌমত্বের দোহাইয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ আইনি বাধা সংস্থাটির নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নির্ভরতা: জাতিসংঘ তার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। যখন বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের পরিপন্থি। কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তখন তারা অনুদান প্রত্যাহার বা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে সংস্থাকে দুর্বল করার সুযোগ পায়। এ নির্ভরতা জাতিসংঘের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে।
কাঠামোগত সংস্কারের অভাব: জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। বিশ্বের বর্তমান ভূ- রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখে নিরাপত্তা পরিষদ ও অন্যান্য অঙ্গের সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিরোধিতার কারণে এ সংস্কার প্রক্রিয়া বারবার মুখথুবড়ে পড়েছে। এ কাঠামোগত স্থবিরতা সংস্থাটির প্রাসঙ্গিকতা ও সক্ষমতাকে ক্ষুন্ন করছে।
অসহায়ত্ব সত্ত্বেও অপরিহার্যতা: জাতিসংঘের এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এর অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। এটিই বিশ্বের একমাত্র প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র এক টেবিলে বসে বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। বড় যুদ্ধ প্রতিরোধে এর সাফল্য সীমিত হলেও আন্তর্জাতিক আইনের বিকাশ, জলবায়ু কূটনীতি, মহামারি মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই। ভেটো ক্ষমতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদ ব্যর্থ হলেও সাধারণ পরিষদ ও অন্যান্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে এখনো সক্ষম।
জাতিসংঘ দিবসে আমাদের বুঝতে হবে, সংস্থাটি তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমষ্টিগত ইচ্ছা ও প্রতিশ্রুতির প্রতিচ্ছবি। এর ব্যর্থতা মানে কেবল জাতিসংঘের ব্যর্থতা নয়, বরং বিশ্বনেতাদের ব্যর্থতা। এ অসহায়ত্ব কাটিয়ে উঠতে হলে জাতিসংঘের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। জাতিসংঘকে শক্তিশালী করা মানে বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বিনিয়োগ করা। এ দিবসে আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার হোক-জাতিসংঘকে আরও শক্তিশালী, ন্যায়সংগত ও কার্যকর করার মাধ্যমে এর অসহায়ত্ব কাটিয়ে ওঠা।
কে বি আনিস: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক প্রকাশকাল: ২৪ অক্টোবর, যুগান্তর।