পানি কূটনীতিকে ‘নীল কূটনীতি’ নামেও অভিহিত করা হয়। গবেষকরা পানি কূটনীতির পাঁচটি মূল দিক নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছেন, যথাঃ রাজনৈতিক, প্রতিরোধমূলক, সংহতিমূলক, সহযোগিতামূলক, ও কারিগরি দিক। আধুনিক পানি কূটনীতি এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আবর্তিত হয়।
১। প্রথমটি হলো রাজনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক দিক, যা পানি কূটনীতিতে একটি ‘ছাদ’-এর মতো কাজ করে। পানি কূটনীতি পানিসম্পদকেন্দ্রিক হলেও তা অনেক সময় বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে।
২। দ্বিতীয়ত, এর প্রতিরোধমূলক দিক রয়েছে, যা বর্তমানে বিরাজমান বা ভবিষ্যতে উদ্ভূত হতে পারে এমন দ্বন্দ্বগুলোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা তৈরিতে জোর দেয়।
৩। তৃতীয়ত, এর সংহতিমূলক ব্যবস্থা পানি কূটনীতিকে বহুমুখী করে তোলে; এটি জলসম্পদকে শুধু পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খাদ্য নিরাপত্তা, জলবিদ্যুৎ এবং পরিবেশগত সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোকে যুক্ত করে।
৪। চতুর্থত, সহযোগিতামূলক দিকটি যৌথ স্বার্থ ও সহযোগিতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে, যা উভয়ের স্বার্থভিত্তিক যৌথ পানি শাসন ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব করে।
৫। পঞ্চমত, কারিগরি দিকটি পানি কূটনীতির ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করে, যার মাধ্যমে পারস্পরিক কারিগরি সহায়তা ও জ্ঞান আদান-প্রদান করা হয়। Water diplomacy aims to resolve or reduce disagreements and conflicts over shared water resources to promote | cooperation, regional stability, and peace.
বাংলাদেশ-ভারত পানি কূটনীতি: পানি কূটনীতির এই আধুনিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের পানি কূটনীতি পর্যালোচনা করলে এর ঘাটতি স্পষ্ট হয়। উভয় দেশ সার্বভৌম হওয়া সত্ত্বেও, তাদের মধ্যকার পানি কূটনীতি মূলত শুষ্ক ও ভরা মৌসুমে পানিবণ্টনকেন্দ্রিক একটি একক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ এবং এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় কেবল ‘ট্র্যাক-১’ বা সরকারি পর্যায়ের কূটনীতিতেই আটকে আছে। ট্র্যাক ১.৫, ট্র্যাক ২ বা মাল্টি-ট্র্যাক কূটনীতির মতো কার্যকরী কৌশলগুলোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রায় নেই বললেই চলে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে যেখানে ভারতের মতো দেশ উজানে চীনের সাথে সমঝোতা করতে পারে, সেখানে বাংলাদেশ তার ভূ-রাজনৈতিক সুবিধার পুরোপুরি ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যেহেতু ‘স্থায়ী শত্রু-মিত্র’ বলে কিছু নেই এবং সম্পর্ক দেওয়া-নেওয়ার জটিল হিসাবের ওপর ভিত্তি করে চলে, সেখানে একপেশে কূটনীতিতে আটকে থাকা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের অভ্যন্তরে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বা নদী গবেষণা ইনষ্টিটিউট-এর মতো অর্ধ ডজনেরও বেশি প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও তাদের কাজের পরিমাণ যৎসামান্য, যা কারিগরি ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। সব শেষ কথা হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বদ্বীপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য বন্যা ব্যবস্থাপনা একটি প্রধান লক্ষ্য হওয়া সত্ত্বেও সরকারগুলো সেই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই বৈরিতা এড়িয়ে, যুদ্ধ বা দ্বন্দ্ব নয়, বরং কূটনীতিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সাফল্যের মতো মূল চাবিকাঠি হিসেবে গ্রহণ করে, উভয়পক্ষেরই কৌশলী হওয়ার বিশদ সুযোগ রয়েছে।