অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এসএমই খাতের গুরুত্ব বর্ণনা করুন। এ খাতের চ্যালেঞ্জ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করুন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। এই খাত দেশের প্রায় ১ কোটিরও বেশি ক্ষুদ্র, কুটির, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ধারণ করে এবং প্রায় ৩ কোটির বেশি মানুষের জীবন-জীবিকার জোগান দেয়। জিডিপিতে প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি অবদান রেখে এবং শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সরবরাহ করে এই খাত দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি নানামুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যা এর টেকসই প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
এসএমই খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ
উচ্চ সুদের হার: মুদ্রানীতিতে কড়াকড়ি আরোপের ফলে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের মূলধনের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কঠিন। এক্ষেত্রে জামানত, জটিল কাগজপত্র এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মতো সমস্যা বিদ্যমান।
সুদের বৈষম্য: বড় ব্যবসায়ীরা সহজে ঋণ পেলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রায়ই ১২- ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদে ঋণ নিতে হয়, যা সিঙ্গেল ডিজিট নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
অন্যান্য সংকট: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণেও এই খাত বিপর্যস্ত।
বেকারত্ব বৃদ্ধি: উচ্চ সুদ এবং খরচ মেটাতে না পারায় উদ্যোক্তারা নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেন বা ছাঁটাই করতে বাধ্য হন, যা বেকারত্ব বাড়ায়।
নারীর ক্ষমতায়নে বাধা: নারী উদ্যোক্তারা ঋণের উচ্চ চাপ সহ্য করতে না পেরে ব্যবসা চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
এসএমই খাতের সুরক্ষায় সুপারিশসমূহ
সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ নিশ্চিতকরণ: ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে হবে।
জামানত ছাড়াই ঋণ: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতমুক্ত ঋণ চালু করা প্রয়োজন।
বিশেষ প্রণোদনা তহবিল: সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা তহবিল গঠন করে এসএমই খাতে সাশ্রয়ী ঋণ বিতরণ করতে হবে।
ব্যাংক কোটা নির্ধারণ: প্রতিটি ব্যাংককে তাদের মোট ঋণের অন্তত ২০-২৫ শতাংশ এসএমই খাতে বরাদ্দ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ডিজিটাল ঋণপ্রাপ্তি: ফিনটেক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য দ্রুত ও সহজলভ্য ঋণব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ছাড়: নারী-নেতৃত্বাধীন ব্যবসার জন্য সুদের হার আরও কমানো যেতে পারে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে কঠোর নজরদারি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধান বাড়াতে হবে। দেশের টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের জন্য এসএমই খাতের সুরক্ষা দেওয়া অপরিহার্য। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের উচিত সুদের হার নিয়ন্ত্রণ, জামানত ছাড়া ঋণ ব্যবস্থা চালু এবং সহজ ঋণ প্রদানের মাধ্যমে এই খাতকে টিকিয়ে রাখা। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহী হবেন, যা জাতীয় অর্থনীতির সার্বিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করবে এবং বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যাবে।
মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশকাল: ১২ অক্টোবর, আমার দেশ।