বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ‘দেশ ব্র্যান্ডিং’ কেন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ক্যাম্পেইন পর্যটন শিল্পের প্রত্যাশা পূরণে কেন ব্যর্থ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়? এর ব্যর্থতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য কী শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে? বিশ্বের অন্যান্য দেশের সফল দেশ ব্র্যান্ডিং উদাহরণ (যেমন: ‘মালয়েশিয়া ট্রলি এশিয়া’, ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’) বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ কী ধরনের ব্র্যান্ডিং কৌশল অনুসরণ করতে পারে?
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিবর্তনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক ধারায় বাংলাদেশকে টিকে থাকতে ও এগিয়ে যেতে হলে একটি সুপরিকল্পিত ও কার্যকর দেশ ব্র্যান্ডিং কৌশল গ্রহণ করা জরুরি ।। ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রচেষ্টা থাকলেও এটি প্রত্যাশা পূরণে পুরোপুরি সফল হয়নি। অপরদিকে, মালয়েশিয়া, ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর সফল ব্র্যান্ডিং অভিজ্ঞতা আমাদের অনুপ্রেরণা হতে পারে।
ব্র্যান্ডিংয়ে বাংলাদেশের সমস্যাসমূহ
বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং এখনো বিচ্ছিন্ন, অনিপুণ ও পর্যাপ্তভাবে কৌশলগত নয়। কারণ-
*একটি একক ও শক্তিশালী জাতীয় ব্র্যান্ড অনুপস্থিত।
*নীতিনির্ধারক, একাডেমিক, বেসরকারি খাত, শিল্প-সাংস্কৃতিক অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ।
*দেশের বাস্তব চিত্র, শক্তি ও সম্ভাবনার প্রতিফলন ঘাটতি
* আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারকারী সফট পাওয়ার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নমুখী।
প্রাসঙ্গিক পরিসংখ্যান ও তথ্য
* ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ১২১টি দেশের মধ্যে ৯৭তম এবং ২০২৪ সালে ৯৬তম অবস্থানে (গ্লোবাল সফট পাওয়ার ইনডেক্স, ব্র্যান্ড ফাইন্যান্স)।
*২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড মূল্য যথাক্রমে ৫০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ৫২৯.৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
* মোবাইল ব্যবহারকারী: ১৮.৮৮ কোটি।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী- ১৩.৬ কোটি (এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট: ১৯১৬ কোটি)। আইটি ফ্রিল্যান্সার: সাড়ে ছয় লাখ।
প্রস্তাবিত কৌশল
• . একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ব্র্যান্ড উন্নয়ন: “রেজিলিয়েন্ট বাংলাদেশ বা ‘পরিবর্তনবান্ধব বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড ধারণা বিবেচনায় নেওয়া ও দেশের প্রকৃত চরিত্র। তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করা যেতে পারে।
বহুমাত্রিক অংশীজন সম্পৃক্ততা: সরকারি, বেসরকারি, একাডেমিক, সিভিল। সোসাইটি, প্রবাসী ও তরুণ উদ্যোক্তা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘দেশ ব্র্যান্ডিং টাস্কফোর্স’ গঠন করা।।
তথ্য-ভিত্তিক ব্র্যান্ডিং ও প্রভাব মূল্যায়ন: সফট পাওয়ার ইনডেক্স ও আন্তর্জাতিক সূচকে নিয়মিত পারফরম্যান্স মনিটরিং করা এবং মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রামাণ্য চিত্রে সমন্বিত প্রচারণা চালানো।
প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী প্রচারণা: ডিজিটাল কনটেন্ট, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, ইন্টার্যাক্টিভ প্ল্যাটফর্মে দেশের ইতিবাচক দিক তুলে ধরা ও টার্গেট মার্কেটভিত্তিক (যেমন: টেক স্টার্টআপ, ট্যুরিজম, কৃষি, ফ্রিল্যান্সিং) প্রচারণা চালানো যেতে পারে।
‘সফট পাওয়ার’ বৃদ্ধিতে সাংস্কৃতিক কূটনীতি: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, খাদ্য, পোশাক, চলচ্চিত্র, সংগীত, খেলাধুলা তুলে ধরার পাশাপাশি দূতাবাসগুলোকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে সক্রিয় করা।
| নীতি সুপারিশ | দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা |
| সুপারিশ জাতীয় দেশ ব্র্যান্ডিং কৌশল প্রণয়ন | তথ্য মন্ত্রণালয়, পর্যটন কর্পোরেশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
| দেশ ব্র্যান্ডিং টাস্কফোর্স গঠন | প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ব্র্যান্ডিং ইউনিট |
| সফট পাওয়ার উন্নয়নে বার্ষিক অ্যাকশন প্ল্যান | সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ICT বিভাগ |
| প্রবাসীদের মাধ্যমে ব্র্যান্ড প্রচার | প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় |
| ‘রেজিলিয়েন্ট বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড লঞ্চ | তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় |
দেশ ব্র্যান্ডিং কেবল প্রচার নয়, বরং একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন, রপ্তানি ও জনসচেতনতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে হলে, এখনই সময় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি দেশ ব্রান্ডিং কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের।
টি. আই. এম. নূরুল কবির, ব্যবসা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক ১৫ অক্টোবর, দৈনিক সমকাল