প্রশ্ন:২-স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জগুলো আলোচনাপূর্বক এ থেকে উত্তরণের পথ কি হতে পারে?
ভূমিকা
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো কৃষি। আর্থিক সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, কৃষি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপ্রতুলতা এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতাও কৃষির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। তবে সময়ের পরিবর্তনে কৃষি খাতে নতুন এক আলো জ্বালিয়েছে প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা-নির্ভর নতুন এক ধারা, কৃষি ভিত্তিক স্টার্টআপ। এসব উদ্যোগ কৃষিকে কেবল আধুনিক ও লাভজনকই করছে না, বরং কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি একটি সেতুবন্ধন গড়ে তুলছে। ফলে টেকসই কৃষি উন্নয়নে এই স্টার্টআপগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ কী
কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ বলতে বোঝায় এমন সব নতুন উদ্যোগ যা প্রযুক্তি, উদ্ভাবনী চিন্তা ও সমাধানের মাধ্যমে কৃষি খাতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। এই উদ্যোগগুলোর কাজের ক্ষেত্র বিস্তৃত যেমন মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, হাইব্রিড বীজ উৎপাদন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া, কৃষি উপকরণ সরবরাহ, সরাসরি বাজার সংযোগ, কৃষকদের ঋণ প্রদান, এমনকি কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহ পর্যন্ত। লক্ষ্য একটাই কৃষিকে অধিক উৎপাদনশীল, লাভজনক এবং পরিবেশবান্ধব করে তোলা ।
কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপের সুবিধা
বর্তমান সময়ে কৃষকের প্রধান সমস্যা হলো সময়মতো সঠিক তথ্য না পাওয়া, প্রযুক্তির ব্যবহার শেখার সুযোগের অভাব, সহজে আর্থিক সহায়তা না পাওয়া এবং ন্যায্য দামে পণ্য বিক্রি করতে না পারা। কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপগুলো এসব সমস্যার সরাসরি সমাধান দিচ্ছে একজন কৃষক ড্রোনের সাহায্যে তার জমির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন, স্মার্টফোনে অ্যাপ ব্যবহার করে আবহাওয়ার তথ্য জানতে পারছেন, এমনকি ডিজিটাল মাধ্যমে কৃষি উপকরণ কিনে নিতে পারছেন। একইভাবে, শহরের ভোক্তারাও এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি কৃষকের উৎপাদিত পণ্য অর্ডার করতে পারছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা হ্রাস পাচ্ছে এবং কৃষক পাচ্ছেন তার ফসলের ন্যায্যমূল্য ।
এই স্টার্টআপগুলো কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারই করছে না, বরং কৃষকদের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে। এখন কৃষকরা নিজের উৎপাদিত ফসলের মান, বাজার চাহিদা ও মূল্য সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। চাষাবাদের পাশাপাশি সংরক্ষণ, প্যাকেজিং এবং বিপণনের ক্ষেত্রেও তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। বড় খামারি থেকে শুরু করে প্রান্তিক ও মৌসুমি কৃষকরাও এ সুবিধার আওতায় আসছেন। কারণ সবারই প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, সময়মতো আর্থিক সহায়তা এবং লাভজনক বাজারে প্রবেশাধিকার।
বাংলাদেশে কৃষি স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে
বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে এবং তা কৃষকদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যেমন iFarmer একটি ডিজিটাল কৃষি প্ল্যাটফর্ম, যা কৃষকদের বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে, কৃষি উপকরণ সরবরাহ করে এবং সরাসরি বাজার সংযোগ তৈরি করে। শহরের মানুষ এই প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করতে পারে, আর কৃষক পায় প্রয়োজনীয় মূলধন। অন্যদিকে Krishokbondhu, Khaas Food, এবং Shudhdho Krishi নামের ই-কমার্সভিত্তিক স্টার্টআপগুলো কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি নিরাপদ খাদ্য সংগ্রহ করে শহরের ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেয়। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে, ভোক্তা পান নিরাপদ খাবার আর কৃষক পান ন্যায্যমূল্য ।
স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার
কৃষিভিত্তিক সমাধান: SmartFarm ও Agroshift-এর মতো উদ্যোগ স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার ছড়িয়ে দিচ্ছে। ড্রোন, সেন্সর ও স্মার্ট সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে চাষাবাদ আরও সহজ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও লাভজনক হয়ে উঠছে। কৃষকরা জমির তথ্য জানতে পারছেন, রোগবালাই শনাক্ত করতে পারছেন এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। হাইব্রিড বীজ ও জৈবসার উৎপাদনে ACI Agribusiness ও BRAC Seed and Agro Enterprise-এর মতো প্রতিষ্ঠান কৃষকের ফলন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে ।
মূলধন সংকট সমাধান: এ ছাড়া Shuttle AgriFinance ও Digital Krishi Loan-এর মতো ফিনটেক স্টার্টআপগুলো সহজ কিস্তিতে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে কৃষকদের মূলধন সংকট দূর করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫০টিরও বেশি কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ সক্রিয় রয়েছে এবং হাজারো কৃষক এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।
কৃষি কল সেন্টার ও ডিজিটাল আবহাওয়া: গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের মধ্যে কৃষি কল সেন্টার ও ‘কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা’ প্ল্যাটফর্মের মতো সেবা ১ কোটিরও বেশি কৃষকের কাছে পৌঁছেছে, যার ফলে কিছু এলাকায় ফসলের উৎপাদন ১২% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটাল আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রায় ৩০ মিলিয়ন কৃষককে চরম আবহাওয়ার ক্ষতি থেকে বাঁচাতে সহায়তা করেছে। ২০২৩ সালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষিঋণ ২৭% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে কৃষক উন্নত কৃষি উপকরণে বিনিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছেন।
স্মার্ট ফার্মিং ও আইওটি: স্মার্ট ফার্মিং ও ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) ব্যবহার করে ৫০০টি খামারে পরিচালিত একটি পাইলট প্রকল্পে দেখা গেছে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ফলন গড়ে ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘শপ’ এবং এ ধরনের অন্যান্য ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস কৃষকদের সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে সংযুক্ত করছে, যার ফলে কৃষকদের আয় গড়ে ২০% পর্যন্ত বেড়েছে। এসব সাফল্য কৃষির ডিজিটাল রূপান্তরকে আরও গতিশীল করছে। একই সঙ্গে সরকারও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা এই অগ্রগতিকে টেকসই করে তুলছে।
কৃষি নীতিমালায় ডিজিটালাইজেশন: কৃষি মন্ত্রণালয় ২০১৮ সাল থেকে জাতীয় কৃষি নীতিমালায় এলাকায় ২০০টিরও বেশি ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করেছে, যা প্রায় ৫০ লাখ কৃষকের কাছে কৃষির ডিজিটালাইজেশনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ৪০ লক্ষাধিক কৃষকের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে এবং কৃষিসংক্রান্ত তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হয়ে কৃষিসংক্রান্ত আধুনিক জ্ঞান পৌঁছে দিচ্ছে। ২০১৬ সালে চালু হওয়া কৃষি কল সেন্টার ইতিমধ্যে
কীটপতঙ্গ ঝুঁকি মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা: কীটপতঙ্গ ঝুঁকি মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (PRAMS) নামের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কীটপতঙ্গের আক্রমণের পূর্বাভাস দিয়ে ২০২২ কর্মসূচির আওতায় ডিএই ১.৫ লক্ষাধিক কৃষককে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যার মধ্যে প্রায়- সালে ২ লাখ একরেরও বেশি ফসল ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেছে। ডিজিটাল সাক্ষরতা ৭৮% কৃষক উন্নত ফলন ও বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। এসব সরকারি পদক্ষেপ ছাড়াও বেসরকারি খাতে LightCastle Partners, BetterStories এবং বিভিন্ন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি তরুণ উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তা দিয়ে কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপের বিস্তার ঘটাচ্ছে।
স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ
তবে এই ইতিবাচক অগ্রগতির মধ্যেও কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের অনেক প্রান্তিক কৃষক এখনো স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারে পারদর্শী নয়, অনেকের কাছে প্রযুক্তি পৌছায়নি বললেই চলে। স্টার্টআপগুলোর জন্য বিনিয়োগ সংগ্রহ করা কঠিন, কারণ কৃষিভিত্তিক উদ্যোগকে এখনো অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। সরকারি সহায়তা অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতা ও বুরোক্র্যাটিক জটিলতায় আটকে যায়, যা উদ্যমী উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। বাজারে প্রতিযোগিতা, মূল্যনির্ধারণে অস্থিরতা এবং প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তর এই খাতের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণ
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। সর্বপ্রথম, কৃষকদের জন্য স্থানীয় ভাষায় সহজবোধ্য অ্যাপ, এসএমএস সেবা ও কল সেন্টারভিত্তিক কৃষি সহায়তা আরও বিস্তৃত করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘ডিজিটাল কৃষি তথ্যকেন্দ্র’ স্থাপন করে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রযুক্তি শেখানোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সরকারি কৃষি অফিস ও এনজিওদের মাধ্যমে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী প্লট ও মাঠ পর্যায়ের সহায়তা আরও জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ভাড়ায় দেওয়ার ব্যবস্থা, ক্ষুদ্রঋণে ভর্তুকি এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কৃষকদের মধ্যে একটি কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। সরকারকে নীতিগতভাবে আরও দ্রুত, সহজ ও উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপগুলো প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায়।
পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়োজন উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, ইনকিউবেশন সেন্টার এবং এক্সেলারেটর প্রোগ্রাম। এসব উদ্যোগ একদিকে যেমন কৃষকদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তেমনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে। সার্বিকভাবে বলা যায়, কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ বাংলাদেশের কৃষি খাতে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে।
এটি প্রযুক্তিকে কৃষির সঙ্গে সংযুক্ত করে, কৃষকদের দক্ষতা ও আয়ের উন্নয়ন ঘটায় এবং কৃষিকে করে তুলছে একটি সম্ভাবনাময় ও মর্যাদাসম্পন্ন পেশা। তবে এই পরিবর্তনকে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা, প্রযুক্তির আরও সহজলভ্যতা এবং নীতিগত সহায়তার জোরালো প্রয়োগ ।
তখনই বাংলাদেশে গড়ে উঠবে একটি স্মার্ট, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃষি ব্যবস্থা যার কেন্দ্রে থাকবে জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী এবং মানবিক কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ। আর এই স্টার্টআপগুলোই হয়ে উঠবে আগামী দিনের কৃষির মূল চালিকাশক্তি। ২৫ জুলাই ২০২৫। ড. রাধেশ্যাম সরকার লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। সূত্র: দেশরূপান্তর ।