অর্থ পাচারের ইতিবৃত্ত
অর্থ পাচার বিশ্বব্যাপী একটি জটিল অর্থ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সমস্যা সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কোনোভাবেই অর্থ পাচার রোধ করা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩ হাজার ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্য ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।
যেভাবে পাচার হয়
কয়েক বছর আগে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল, ইনটিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ পাচার হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে। পণ্য আমদানিকালে ওভার ইনভয়েসিং এবং পণ্য রপ্তানিকালে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে এই অর্থ পাচার হয়। সংস্থাটি বলেছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। বিভিন্ন অন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের চিত্র ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি আমরা অর্থ পাচারের বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করি ।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার হয় তার চার ভাগের তিন ভাগ অর্থপাচার হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে। কোনো কোনো দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের ৮০ শতাংশেরও বেশি পাচার হয়ে থাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে। পণ্য আমদানিকালে অতিমূল্যায়ন এবং পণ্য রপ্তানিকালে অবমূল্যায়নের মাধ্যমে এই অর্থ পাচার করা হয়।
বাংলাদেশের জন্য অর্থ পাচার একটি জটিল সমস্যা এবং এই সমস্যা থেকে কোনোভাবেই পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থ পাচারের ঘটনা বিভিন্ন সময় উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে, ব্যক্তি পর্যায়ে অর্থ পাচারের ঘটনার বিষয় অনেক সময় জানা যায়। কিন্তু অর্থ পাচারের অভিযোগে দোষীদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি প্রদানের ঘটনা খুব একটা নেই বললেই চলে। আমরা যে স্টাডি করি, তার উদ্দেশ্য ছিল অর্থ পাচারসংক্রান্ত আইনের ফাঁকগুলো খুঁজে বের করা এবং কেন আমরা অর্থ পাচারকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে পারছি না, তার কারণ অনুসন্ধান করা।
অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নয়
সিংগাপুরে অর্থ পাচার রোধে আইনের বাস্তবায়নের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো। তারা বিগত এক বছরে ৯টি ব্যাংককে বড় অঙ্কের জরিমানা করেছে। অর্থ পাচারকারীদের অনেককে জেলে আটক করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে গত এক বছরে অর্থ পাচারের অভিযোগে কাউকে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। তার অর্থ হচ্ছে, আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকার কারণে সিংগাপুরের চেয়ে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের আশঙ্কা নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি। আমরা বলি, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। অথচ আমরা অর্থ পাচারকারীদের ধরে শাস্তির আওতায় আনতে পারছি না।
অনুসৃত নীতিমালা পর্যবেক্ষণ
দেশে ব্যবসায় রত ব্যাংকগুলোর দুই-তৃতীয়াংশকে আমাদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেছি। অর্থপাচার রোধে আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত নীতিগুলো এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২০১৯ সালে অর্থ পাচার রোধে যে গাইডলাইন ইস্যু করা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো তা কতটা বাস্তবায়ন করেছে আমরা তা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করেছি। গাইডলাইনের চারটি পিলার আছে যা বাস্তবায়ন পর্যায়ে বিবেচনা করার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ অবকাঠামো পর্যায়ে, গ্রাহক পর্যায়ে, লেনদেন পর্যায়ে এবং এন্টারপ্রাইজ লেভেলে দেখা হয়। এই পিলারগুলো বাস্তবায়নের জন্য বাড়তি অর্থ বিনিয়োগের ব্যাপার আছে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকগুলো বিষয় আছে, যা পরিমাপ করা যায় আবার কোনো কোনো বিষয় আছে যা পরিমাপ করা যায় না।
আইন বাস্তবায়নে অনীহা
আমরা মতামত জরিপের মাধ্যমে সার্কুলারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করেছি। যেখানে প্রয়োগের ব্যবধান লক্ষ করা গেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সফলতার যে দাবি করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ মনে হয়নি। অর্থাৎ প্রয়োগ ব্যবধান বাস্তব ক্ষেত্রে হয়তো আরো বেশি। সার্বিকভাবে আমাদের গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, ব্যাংকগুলো অর্থ পাচার রোধে বিদ্যমান আইন ও গাইডলাইন বাস্তবায়নে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। জারিকৃত সার্কুলার সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, এ ব্যাপারটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক যথাযথভাবে পরিমাপ এবং এজন্য পর্যাপ্ত প্রণোদনাও নিশ্চিত করা হয়নি। আইনে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার বিধান আছে। কিন্তু শুধু শাস্তির বিধান থাকলেই তো চলবে না। ।
যিনি অপরাধ করেছেন, তাকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এটা না করা গেলে আইন কোনোভাবেই কার্যকর করা সম্ভব নয়। আইন আছে, আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে, কিন্তু অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়, উদ্যোগের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। জারিকৃত আইন কতটা বাস্তবায়িত হলো বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কি এসব ভালোভাবেই যাচাই করা দরকার ছিল, কিন্তু সেখানেই আমাদের ব্যর্থতা রয়েছে।
অর্থপাচার রোধে যা করা যেতে পারে
অর্থ পাচার রোধকল্পে জারিকৃত আইনগুলো বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সময় নির্ধারণ করে দিতে পারে। যেসব ব্যাংক আইন বাস্তবায়নে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবে, তাদের পুরস্কৃত করা যেতে পারে। আর যারা আইন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হবে, তাদের জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। এজন্য একটি বিশেষ ফান্ড তৈরি করা যেতে পারে।
যেসব ব্যাংক অর্থ পাচার রোধে প্রণীত আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করতে পারবে তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। যেসব ব্যাংক আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হবে, তাদের জরিমানা করে সেই জরিমানার অর্থ সফল ব্যাংকগুলোকে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া যেসব ব্যাংক আইন বাস্তবায়নে সফল হবে, তাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল প্রতি বছরের পরিবর্তে দুই বছর অন্তর সুপারভিশনে যাবে এরকম কিছু প্রণোদনা থাকতে পারে। যেসব ব্যাংক আইন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হবে, তাদের ক্ষেত্রে প্রতি বছর সুপারভিশনে যাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল আছে, তার সুদের হার ভিন্ন করা যেতে পারে। যেসব ব্যাংক অর্থ পাচার রোধে প্রণীত আইন বাস্তবায়নে সফল হবে, তাদের ক্ষেত্রে পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের সুদের হার তুলনামূলক কম হবে। আর যারা আইন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হবে, তাদের ক্ষেত্রে পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের সুদের হার বেশি হবে।
অর্থ পাচার খুজে পাওয়া জটিল
ব্যাংক খাতে সংক্রান্ত তথ্যাদি পর্যবেক্ষণকালে আমরা একটি বিষয় লক্ষ্য করি, যেসব দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেশি সেই সব ক্ষেত্রে অর্থ পাচার বেশি হয়েছে। খেলাপি ঋণের যে অংশ দেশে থাকে, তাতে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হয়। আর যে অংশ দেশের বাইরে চলে যায়, তার ক্ষতির পরিমাণ বেশি। যে অর্থ দেশের উন্নয়নে ব্যায়িত হতে পারত, তা অন্য দেশের উন্নয়নে ব্যবহৃত হচ্ছে। খেলাপি ঋণের যে অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে বা পাচার করা হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমরা জানি না বা জানা সম্ভব নয়।
এমনকি দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের মধ্যে কত অংশ বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত তার হিসাবও আমাদের কাছে নেই। ব্যাংকগুলো অধিকাংশ সময়ই বাণিজ্যবিষয়ক খেলাপি ঋণকে টার্ম লোনে কনভার্ট করে রিপোর্ট করে থাকে। ফলে বোঝার উপায় থাকে ন কী পরিমাণ বাণিজ্যসংক্রান্ত খেলাপি ঋণ, যা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং অর্থ পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে।
খেলাপি ঋণকে আলাদাভাবে দেখাতে হবে
আমরা যে সুপারিশ করছি, ব্যাংকগুলোকে বাণিজ্যবিষয়ক খেলাপি ঋণকে আলাদাভাবে প্রকাশ করতে হবে। পণ্য আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে যখন বাণিজ্যচুক্তি হয়, তখন আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো হয়। এসব পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণ করা অবশ্যই সহজ কাজ নয়। এছাড়া বাণিজ্য চুক্তিগুলোর বেশির ভাগেরই আইনগত ভিত্তি নেই। যার ফলে কোনো ধরনের সমস্যা বা চুক্তি ভঙ্গ হলে আইনগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকে না।
উন্নত দেশ কেন অনীহা দেখায়
এজন্য সরকার এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে। অন্য দেশগুলো বা আমাদের বাণিজ্য সহযোগীরা এক্ষেত্রে সব সময় সহযোগিতা করবেন, এমন আশা করা ঠিক নয়। উন্নত দেশগুলো অর্থ পাচার রোধে আন্তরিক নয় বলে অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন। প্রশ্ন হলো, উন্নত দেশগুলো অর্থ পাচার রোধে আন্তরিক কেন হবে? অর্থ পাচার হলে উন্নত দেশগুলোর কোনো ক্ষতি নেই, বরং লাভ রয়েছে। ক্ষতি যা হওয়ার, তা উন্নয়নশীল দেশের হয়। এমন অনেক দেশ আছে, যারা অর্থ পাচারকে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে থাকে। যেমন অনেক দেশ সেকেন্ড হোম নামে প্রকল্পের মাধ্যমে অন্য দেশ থেকে পাচারকে উৎসাহিত করে চলেছে। উপরন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়।
উপসংহার
অর্থ পাচার বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে আরো কঠিন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। কারণ একবার অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন কাজ। তাই অর্থ পাচার রোধে পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ড. শাহ্ মো. আহসান হাবিব লেখক: অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)। অনুলিখন: এম এ খালেক। ১৮ আগস্ট, ২০২৫। সূত্র: ইত্তেফাক।