ভূমিকা
পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ দিন দিন বাড়ছে। এসব দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে উপকূলীয় অঞ্চল ও বিশ্ব উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরার মতো জলবায়ু নদীবিধৌত দেশগুলো। বাংলাদেশ একদিকে নদীমাতৃক দেশ, অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে নিম্নভূমিগুলোর একটি। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখানে আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে
জলবায়ু শরণার্থী
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান নদীভাঙন, লবণাক্ততার বিস্তার এবং উর্বর কৃষিজমির ধ্বংসের ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এদের অনেককেই এখন “জলবায়ু শরণার্থী” হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ঘরবাড়ি হারানো মানুষজন বাধ্য হয়ে শহরের বস্তি বা অন্য কোনো অস্থায়ী আশ্রয়ে গিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির মধ্যে পড়ে মানুষ বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে। প্রশ্ন হলো–এখন যে পরিস্থিতি আমরা দেখছি, তা কি কেবল বর্তমানের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাচ্ছে, নাকি এটি আসছে কোনো বড় বিপর্যয়ের আগাম বার্তা?
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। উপকূলীয় জেলার মধ্যে বরগুনা, পটুয়াখালী, খুলনা ও সাতক্ষীরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস আরও ভয়াবহ -২০৫০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র বাংলাদেশেই প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত হতে পারে। ইতিমধ্যেই ঢাকার বস্তিগুলোতে উপকূলীয় মানুষের ভিড় বাড়ছে। ঢাকার মতো শহরে গ্রাম থেকে আসা মানুষের এই ঢল একদিকে সামাজিক চাপ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।
জলবায়ুজনিত ক্ষতিকর প্রভাব
প্রতি বছর এত মানুষ কেন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্ব হারাচ্ছে? সব দোষ কি প্রকৃতির? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অতিবৃষ্টি বেড়েছে। এর ফলে ঘরবাড়ি ও ফসল নষ্ট হচ্ছে, নদীভাঙনে বসতভিটা বিলীন হচ্ছে। পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে কৃষিজমি অচাষযোগ্য হয়ে পড়ছে। জীবিকা হারাচ্ছেন কৃষকরা। নাকি মানুষেরও দায় আছে? একে অপরিকল্পিত বাঁধ, নদী দখল ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। বন্যার পানি সঠিকভাবে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই, ফলে ড্রেনেজ সমস্যায় অনেক এলাকা দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকে।
নদীভাঙন যেন বাংলাদেশিদের জন্য এক অভিশাপ। প্রতিবছর নদীভাঙনের কবলে পড়ে হাজার হাজার মানুষ তাদের সবকিছু হারাচ্ছে। আর বন্যা? বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে বন্যা হচ্ছে। এতে উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যায়, ভেঙে পড়ে মানুষের জীবনযাত্রা। গ্রামের মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে যখন শহরে আসে, তারা মূলত হয়ে যায় অদৃশ্য শরণার্থী। আন্তর্জাতিক আইনে জলবায়ু শরণার্থীর স্বীকৃতি নেই। ফলে তাদের জন্য নেই কোনো আইনি সুরক্ষা বা সুবিধা । ঢাকার বস্তিগুলোতে গেলে বোঝা যায়, কীভাবে পটুয়াখালী বা ভোলার মানুষ চরম দারিদ্র্য নিয়ে এখানে নতুন জীবন শুরু করছে। স্কুলছুট শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে, অস্থায়ী চাকরিতে যুক্ত হচ্ছে গ্রামের নারী ও কিশোরীরা, অপরিকল্পিত বসতিগুলোতে বাড়ছে রোগবালাই ও অপরাধ। এভাবে শহরের ওপর চাপ বাড়ছে এবং একইসাথে মানবিক বিপর্যয়ের নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে।
কেন স্থায়ী সমাধান হয় না
বাংলাদেশের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ রাষ্ট্রে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো–টেকসই বাঁধ ও নদীব্যবস্থাপনা প্রকল্পের ঘাটতি রয়েছে, পুনর্বাসন ব্যবস্থা সীমিত, দুর্যোগ মোকাবিলায় অবকাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট। ফলে ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা হওয়ার পর সরকার জরুরি সহায়তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হয় না।
সমাধানে যে সব পদক্ষেপ নিতে হবে
বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার সমাধান অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা চাই সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট, এবং আন্তরিক বাস্তবায়ন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাঁধ নির্মাণ, পুরনো বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত খনন প্রয়োজন । এতে নদীভাঙন কমবে এবং পানির নিষ্কাশন সহজ হবে।
যেসব মানুষ কৃষিজমি হারিয়ে ফেলছে, তাদের জন্য ছোট শিল্প, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে তারা শহরমুখী হবে না। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে যত্রতত্র না পাঠিয়ে পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের দায় সবচেয়ে বেশি। তাই জলবায়ু তহবিল (Climate Fund) ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে খরা, লবণাক্ততা ও বন্যা সহনশীল ফসল নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে।
আমরা যদি এখনই পদক্ষেপ না নেই, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা কয়েক কোটিতে গিয়ে ঠেকবে। এতে যে বিপর্যয় আসবে– সামাজিক সংকট; বেকারত্ব, অপরাধ প্রবণতা, শহরে বাড়তি জনসংখ্যা সামলাতে অবকাঠামোর ওপর চাপ, এবং এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের দায় যেহেতু মূলত শিল্পোন্নত দেশের, তাই তাদের দায়িত্বও সমানভাবে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থায়ন এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে হবে।
উপসংহার
আমার মনে হয়, জলবায়ু শরণার্থী এখন আর কোনো কল্পিত ভবিষ্যৎ নয়–এটি আমাদের বর্তমানেরই কঠিন বাস্তবতা। প্রতিদিন বন্যা, নদীভাঙন ও উপকূলীয় দুর্যোগে হাজারো মানুষ নিজের জন্মভূমি হারিয়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশ আরও ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের দায় বহন করবে পুরো বিশ্ব, কিন্তু তার সবচেয়ে ভারী বোঝা বইতে হবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ।
জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে, তবে সেটি একসময় শুধু বাংলাদেশের নয়–পুরো বিশ্বের জন্যই এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হবে। তাই এখনই সময়, বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার।
৩১ জুলাই, ২০২৫। নুসরাত জাহান স্মরনীকা: লেখক : গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। সূত্র: ডেল্টা টাইমস।