ভূমিকা জলবায়ু হলো পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদী আবহাওয়ার গড় রূপ এবং এর গড় তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতি-স্থিরতা ইত্যাদি উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে উঠে। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রা শতকে 1.7°C হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা গত ৭,০০০ বছরের গড় প্রবণতার তুলনায় লক্ষণীয় ঊর্ধ্বগতি নির্দেশ করে। প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই অক্সাইডের গড় ঘনত্ব বর্তমানে ৪২০ পিপিএমের উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা শিল্পায়নের পূর্ববর্তী ২৮০ পিপিএমের তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক ।
বায়ুমন্ডলে বৃদ্ধি পেয়েছে
মানুষের ক্রমবর্ধমান জীবাশ্ম জ্বালানি দহন, কৃষি কার্যকলাপ ও জীবনের অন্য ক্রিয়াকলাপ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরনের প্রধান কারণ। বায়ুমণ্ডলে CO2 ছাড়াও মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের ঘনত্বও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুতগতিতে চলছে। বর্তমান গড় তাপমাত্রা শিল্পায়নের পূর্ববর্তী স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় 1.°C ঊর্ধ্বে। IPCC এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি উষ্ণায়ন RCP 8.5 পথ অনুসরণ করে, তবে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ উচ্চতা ০.৬-১.১ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির ফল
সম্পাদকীয় সমাচার জুলাই, ২০২৫৯৩ ONDGAIN সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী ২৪তম সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং ১৬৮তম প্রস্তুতশীল দেশ। দুর্বল অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের অভিযোজন সক্ষমতা সীমিত। ক্লাইমেট বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি প্লাবিত হবে এবং ২০ মিলিয়ন মানুষ স্থানচ্যুত হতে পারে। নদী এলাকা প্লাবিত হওয়ার ফলে ৩.৫ মিলিয়ন মানুষ প্রতিবছর সম্ভাব্য বন্যায় বাড়ির বাইরে থাকতে বাধ্য হবে।
বিশ্বব্যাংকের Climate Knowledge Portal অনুসারে, ২০৫০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের ফ্রিকোয়েন্সি বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই ঝড়গুলো ব্রেকিং পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেলে ভারী বৃষ্টিপাত ও প্রবল বন্যার সৃষ্টি করে, যার ফলে মানুষের প্রাণহানি ও সম্পদ ক্ষতি বাড়ে।
কৃষিতে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব
বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলকভাবে বৃষ্টিপাতের তুলনায় বেশি। চাহিদার তুলনায় ফসলের ফলন ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে। তাপদাহ, জলজজীবাণু দ্বারা সৃষ্ট রোগ এবং vector-borne রোগ (যেমন ডেঙ্গু) এর বিস্তার বেড়ে যাবে। বন্যা ও শুকনো মৌসুম উভয়েই পানিশোধন সমস্যার কারণে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় । উত্তাপ এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ম্যানগ্রোভ বন, স্যালাইন জলাভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুসংস্থান হুমকিতে রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ততার বৃদ্ধি নদীর তাজা পানির জীববৈচিত্র্যকে প্রভাবিত করে। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে স্বতঃস্ফূর্ত অবদান (NDC) নির্ধারণ করা হয়েছে। IPCC নির্দেশ দেয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও টেকসই জীবনধারা গড়ে তোলার উপর ।
কার্যক্রম বাস্তবায়ন
২০০৯ সালের BCCSAP পরিকল্পনা অনুযায়ী সাড়ে ছয়টি থিম (জলবায়ু সংক্রান্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক, কৃষি, সিচাই, স্বাস্থ্য, জৈব-বৈচিত্র্য) নিয়ে ৪১টি কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ: ২০২৩ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তি মাত্র ১.৩ শতাংশ ভূমিকা রাখে, যা বৈশ্বিক গড় ১৫ শতাংশের তুলনায় অত্যন্ত কম ৷
ম্যানগ্রোভ পুনর্নির্মাণ ও নদী বেষ্টনীর কাজ: উপকূলীয় এলাকা বন্যা ও সুনামি শোষণে কার্যকর ।
কমিউনিটি-ভিত্তিক বনায়ন: স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও কার্বন সঙ্কলন বাড়ায় ৷
চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ : অভিযোজন কার্যক্রমে পর্যাপ্ত তহবিল যোগান দেওয়ার জন্য সবুজ জলবায়ু তহবিল (এঈঋ) ও জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল (Adaptation Fund) এর অর্থায়ন বাড়ানোর প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোকে ক্লিন টেকনোলজি স্থানান্তরে সহায়তা করতে হবে। গ্রামীণ স্বল্পায়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অভিযোজন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্বনির্ভর করতে হবে। আধুনিক মনিটরিং সিস্টেম ও ডেটা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। বিদ্যমান পরিবেশ-সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ ও সংশোধনের মাধ্যমে জলবায়ু সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
উপসংহার
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ এক গভীর সংকট মোকাবিলা করছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান, অতিরিক্ত মৌসুমি ঝড়- বন্যা এবং কৃষি ও জনস্বাস্থে। নেতিবাচক প্রভাব এ সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে। তবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে শমন ও অভিযোজনের পন্থা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারি। সময়টুকু হাতে নেই- এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব।
সাদিয়া সুলতানা রিমি লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। ২৪ এপ্রিল, ২০২৫। সুত্রঃ প্রতিদিনের সংবাদ ।