বিগত বছরের মূল্যস্ফীতি
২০২২ সালের আগস্ট মাসে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশের মতো বাড়িয়ে দেয়। এরপর ব্যাংক খাতে বহুল আলোচিত ৬ শতাংশ (ডিপোজিটরদের জন্য) এবং ৯ শতাংশ ( ঋণগ্রহীতার জন্য) সুদের হার প্রবর্তন করে। ফলে ঋণ সস্তা হয়ে পড়ে। বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। যার ফলাফল উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা বর্তমানে দৃশ্যমান ।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রয়োগ
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের শুরুতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেন। এ সিদ্ধান্ত অনেক দেরিতে নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে, বাংলাদেশ তখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে নীতি সুদহার (রেপো) বাড়িয়ে বাজারে অর্থের জোগান কমানো হয়। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। দুঃখজনক যে, নীতি সুদহার বাড়ানো সত্ত্বেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি (যেটা জুনডিসেম্বর ২০২৩-এর জন্য ঘোষণা করা হয়েছিল) ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়। বিবিএসের তথ্য মোতাবেক, ২০২৩-এর ডিসেম্বরের শেষে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।
বিবি‘র চারটি চ্যালেঞ্জ এ মাসের ১৭ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য জানুয়ারি-জুন ২০২৪ সময়ের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো— (১) মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ; (২) ব্যাংকগুলোতে তারল্যের জোগান বাড়ানো; (৩) খেলাপি ঋণ কমানো ও ডলার-সংকট মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানো। এছাড়াও বিনিময় হার স্থিতিশীলতা রাখার জন্য এবারের মুদ্রানীতিতে ক্রলিং পেগ পদ্ধতি ঘোষণা করেছে ।
মুদ্রানীতিতে যা করা হয়েছে
রেপো ও বিশেষ রেপো: বাণিজ্যিক ব্যাংক যখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করে, তখন তার সুদহার নির্ধারণ করা হয় রেপো বা নীতি সুদহারের মাধ্যমে। এটা বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে। এবারের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার (রেপো) বাড়িয়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। আগে ছিল ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিশেষ রেপো বা স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে।
রিভার্স রেপো : রিভার্স রেপোর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখে। রিভার্স রেপো বা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) সুদহার বিদ্যমান দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৭৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এ বছরের জুন পর্যন্ত জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ । মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ব্রড মানির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। নিট বৈদেশিক সম্পদের ক্ষয় ২ দশমিক ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এবারের মুদ্রানীতির ধরন হলো, ‘সতর্ক ও সংকুলানমুখী। প্রশ্ন হলো পূর্বে নীতি সুদহার বাড়ানো সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি কমেনি। কেন? আগামী দিনে মূল্যস্ফীতি কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতিয়ার নীতি সুদহার প্রয়োগ নীতি সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা ও নিম্নসীমার মধ্যে ব্যবধান ২০০ শতাংশ পয়েন্ট থেকে কমিয়ে ১৫০ শতাংশ পয়েন্টে নামিয়ে আনা হয়েছে। যুক্তি হলো-নীতি সুদহার বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদহার বাড়বে, ফলে ঋণের চাহিদা কমে যায়। এর মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কমে গেলে মূল্যস্ফীতি কমবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে নীতি সুদহার বাড়ানো বা কমানো; সেই হাতিয়ার ব্যবহার করেছে এবারের মুদ্রানীতিতে। গত জুন মাসে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে সুদহারের সীমা তুলে দেয়া হয়েছিল। নতুন এই মুদ্রানীতির সুদহার বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হার বছর শেষে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ডিসেম্বর শেষে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।
সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ঘোষিত মুদ্রানীতিতে ২০২৪ সালের জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশ ও সরকারি খাতে লক্ষ্যমাত্রা ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ২ শতাংশ; সরকারি খাতে ছিল ১৮ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমন, বিনিময় হারের চাপ নিয়ন্ত্রণ, সরকারের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় অর্থের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে মুদ্রানীতিতে।
‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি মুদ্রানীতিতে একই সাথে ডলারের বিনিময় মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘ক্রলিং পেগ’ নামে নতুন একটি পদ্ধতি ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে। ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতিতে একটি মুদ্রার বিনিময় হারকে একটি সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমার মধ্যে ওঠানামা করার অনুমতি দেয়া হয়। ফলে একবারেই খুব বেশি বাড়তে পারবে না, আবার কমতেও পারবে না। গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে ডলার সঙ্কট চলছে। এতে ডলারের আনুষ্ঠানিক দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। তবে নতুন পদ্ধতিতে ডলারের বিনিময় হার কত হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ আদায়ে বেসরকারি উদ্যোগে ‘সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ গঠনের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে।
নতুন মুদ্রানীতির প্রভাব নতুন মুদ্রানীতির ফলে ব্যাংক ঋণ নেয়া আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক হিসেবেই দেখছেন। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বৃদ্ধি একটি উপায় মাত্র; তবে কেবল এর মাধ্যমেই যে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে মনে হয় না; বড়জোর আংশিক ভূমিকা পালন করতে পারে। সুতরাং অন্য নিয়ামকগুলোর প্রতিও দৃষ্টি দিতে হবে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতকে ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত করে সরকার মোটা অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হবে না। এ ছাড়া বিদেশী মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতির ব্যবহার করে খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না। ডলারের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার চেয়ে বরং মার্কেট ওপেন করে দেয়াই ভালো। বাজার উন্মুক্ত করে দিয়ে সেটি ভালোমতো মনিটরিং করা প্রয়োজন। একই সাথে, দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কী ধরনের ম্যাকানিজম ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। এমনকি টার্গেট নির্ধারণ করে তার অর্জনও জানানো উচিত।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু পদক্ষেপ দেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গত এক বছরে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইএমএফের ঋণের শর্তানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহারের করিডোর প্রথা চালু, সুদহারের সীমা প্রত্যাহার, ডলারের একক দাম, রিজার্ভের প্রকৃত হিসাবায়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি রোধে মুদ্রা সরবরাহনির্ভর নীতি থেকে সরে এসে সুদহার লক্ষ্য করে মুদ্রানীতি প্রণয়ন শুরুর ঘোষণা দেয়া হয়। এত পদক্ষেপের পরও বাজারে এর কমই প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। জুলাই-ডিসেম্বর মাসের জন্য যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়, সেখানে তিনটি মূল্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, লেনদেনের ভারসাম্য সমন্বয় করা এবং নন-পারফর্মিং লোনের হার কমিয়ে আনা,
আইআরসি পদ্ধতি: উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ইন্টারেস্ট রেট করিডোর (আইআরসি) একটি বিষয় নিয়ে আসা হলো। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে লিকুউডিটি কমিয়ে আনা এবং ঋণের সুদহারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এর দুটি মূল রেট হলো স্টাডিং লেন্ডিং রেট (এসএলএফ) বা সিলিং রেট এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট রেট (এসডিএফ) বা ফ্লোর রেট। ইন্টারেস্ট রেট করিডোরের মাধ্যমে ইন্টারব্যাংক রেটকে ফ্লোর এবং সিলিং রেটের মাঝে মুভ করানো যায় ।
পলিসি রেটের পরিবর্তন: পলিসি রেটের পরিবর্তনের কারণ কস্ট অব বরোইং বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই লক্ষ করা যায়, যখন মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়, তখন তারা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মূল উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য হচ্ছে কীভাবে বাজারে মুদ্রার জোগান কমিয়ে আনা যায়। বাংলাদেশও সেই কাজটিই করেছে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখনো সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
স্প্রেড : দেশের অর্থনীতিবিদদের অধিকাংশই ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক করার জন্য পরামর্শ দিলেও তা করা হয়নি। এখন বিলম্বে হলেও আইআরসির মাধ্যমে ঋণের সুদের হারের পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সুদের হার নির্ধারণের বিষয়টি সম্পূর্ণারূপেই ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, তা পলিসি রেট দ্বারা নির্ধারিত হয়। ব্যাংক আমানতকারীদের যে সুদ প্রদান করে এবং ঋণগ্রহীতাদের নিকট থেকে যে সুদ আদায় করবে, এর মাঝে যে গ্যাপ, সেটাই ব্যাংকের স্প্রেড।
স্মার্ট রেট: ব্যাংক ঋণের সুদের হার নির্ধারণের জন্য স্মার্ট রেট রয়েছে। বন্ডের সুদের হারের গড়ের ওপর নির্ভর করে স্মার্ট রেটের পরিবর্তন হয়। বর্তমানে বন্ডের সুদের হার যথেষ্ট বেশি। সম্প্রতি স্মার্ট রেট বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় সাড়ে আট শতাংশ করা হয়েছে। ফলে এখন ব্যাংকের ঋণের সুদের হার দাঁড়াবে ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ। তার অর্থ হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিডিউল ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণপ্রাপ্তি ব্যয়বহুল করে বাজারে মানি সার্কুলেশন কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তবে মুদ্রা ছাপিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারকে অর্থ সরবরাহ করা হলে মূল্যস্ফীতি কীভাকে নিয়ন্ত্রিত হবে? অর্থ ছাপানোর প্রচেষ্টা থেকে সরকার অবশ্য ইতিমধ্যেই সরে এসেছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি বক্তব্য অনুযায়ী ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আশরাফ আহমেদ অবশ্য মনে করেন, নতুন মুদ্রানীতি দেশের আর্থিক খাতকে পুনরুজ্জীবিত ও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বাজায় রাখতে সহায়তা করবে; রিজার্ভ স্থিতিশীল ও মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে সহায়তা করবে; মুদ্রা বিনিময়হার ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে মুদ্রানীতিতে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে ইতিবাচক হবে। তার মতে, সর্বশেষ ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ‘স্মার্ট’-এর ওপর ভিত্তি করে ঋণের সুদহার নির্ধারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, যা খুব বেশি কার্যকর হয়নি। তবে এবারের মুদ্রানীতি অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যথাযথ আর্থিক ঋণকে শল গ্রহণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে অধিক হারে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিতকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগ গ্রহণ করবে। সরকারি খাতে ঋণ হ্রাসের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধিকল্পে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রতাসাধন এবং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ওপর তিনি জোরারোপ করেন।
দেশে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তারল্য বৃদ্ধিকল্পে ‘এক্সপোর্টার রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) হার আগের চেয়ে অনেক নামিয়ে আনা হয়েছে। এ ছাড়া পেমেন্টের ক্ষেত্রে রেগুলেটরি ক্যাপিটালের ৪০ শতাংশ অফশোর ব্যাংকিং অপারেশন্স থেকে ধারের সুযোগ দিয়েছে ঘোষিত নীতিতে। এর ফলে, বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে।
সুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কতটা সফল মূলত উন্নত অর্থনীতির দেশে জনগণ শতভাগ কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, সেসব দেশে- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার নীতি কার্যকর হয়। উন্নত অর্থনীতির দেশে ভোক্তার চাহিদা থাকে ঊর্ধ্বমুখী, ফলে সুদের হার বাড়ানোর উদ্দেশ্য হয় ভোগ কমিয়ে আনা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ তেমন সম্ভব হয় না। সুদের হার বৃদ্ধি করলে ভোগের চাহিদা হয়তো কিছুটা সীমিত হয় তবে এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগও কমে যায়। বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে, ফলে দেশে বেকারত্ব বাড়ে। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আশানুরূপ হারে বৃদ্ধি পায় না। সরকার নিজেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ থেকে নামিয়ে আগামী জুনে সাড়ে ৬ শতাংশের টার্গেট নিয়েছে। ফলে দেশের বেসরকারি খাত নিরুৎসাহিত বোধ করবে এবং বিনিয়োগ সীমিত হয়ে আসবে। বিনিয়োগ কমে গেলে আমাদের সরবরাহে ভাটা পড়বে । এভাবে যদি সরবরাহ কমতে থাকে তাহলে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ এমপ্লয়েড অর্থনীতিনির্ভর নয়, এখানকার অর্থনীতি শক্তিশালী করতে বিনিয়োগের ওপর জোর দিতে হবে। সুতরাং বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুদের হার না বাড়িয়ে বরং কমিয়ে রাখা উচিত। কারণ সুদের হার বৃদ্ধি করলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে; পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। এভাবে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে তো মূল্যস্ফীতিটা থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির কারণ চলতি লেনদেনে ঘাটতি: বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির মূল কারণ চলতি লেনদেনে ঘাটতি লেনদেনে ঘাটতি চলতে থাকলে রিজার্ভ কমে যাবে; টাকার মান কমে যাবে; আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং রিজার্ভ বাড়িয়ে টাকার মান ধরে রাখতে পারলে আমদানি ব্যয় কমবে। এর জন্য প্রয়োজন রেমিট্যান্স প্রবাহ ঠিক রাখা। রেমিট্যান্স কমার কারণ বাংলাদেশীরা কম উপার্জন করছে তা নয়; বরং বাংলাদেশীরা আগের চেয়ে বেশি উপার্জন করছে। কিন্তু ডলার বিদেশে আয় করে বিদেশেই রেখে দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া দুর্নীতি, ঘুষ, ব্যাংক লুট এবং আন্ডারওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে। সুদের হার না বাড়িয়ে রেমিট্যান্স দেশে আনার ব্যবস্থা এবং দেশের অর্থ বিদেশে পাচার বন্ধ করতে হবে ।
অভ্যন্তরীণ বাজারের অকার্যকারিতা: বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির আরেকটি কারণ অভ্যন্তরীণ বাজার ঠিকমতো কাজ করছে না। বাজারে প্রতিযোগিতা এবং স্বচ্ছতা নেই। এখানে সিন্ডিকেট হয়ে যায়। কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এটি সরকারকে ট্যাকেল করতে হবে। সুদের হার বৃদ্ধি করে এ ধরনের মূল্যস্ফীতি রোধ করা যায় না। এমনকি বিনিময় হার যদি স্থিতিশীলও হয়, তার পরও মূল্যস্ফীতি কমানো যাবে না, যতক্ষণ না সিন্ডিকেট বন্ধ করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদফতরকে কার্যকরী করতে হবে। সরকারকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। বড় কিছু শিল্পগোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে বাজার । এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত না করতে না পারায় ক্ষণে ক্ষণে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যায়, অথচ সরবরাহ স্বাভাবিক। পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ও আলুর সিজনেও অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যায় ।
বৈদেশিক বাজারের ভঙ্গুরতা: দেশের রফতানি বাড়ছে, রেমিট্যান্স বাড়ছে, বৈদেশিক ঋণ যেখান থেকে চাইছি পাচ্ছি। তার পরও আন্তর্জাতিক তিনটি রেটিং কোম্পানি ঋণমানকে ‘ডি গ্রেড’ দিয়েছে। এখন এলসি খুলতে ক্যাশ ফরেন এক্সচেঞ্জ দরকার হয়। লোন দিতে থার্ড পার্টি গ্যারেন্টার হতে হয় এবং সুদের হার বেশি চায় তারা। এগুলো আমাদের বুঝতে হবে। ফলে দ্রুত খারাপ হয়ে যাচ্ছে অর্থনীতি যার ভুক্তভোগী মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত; যাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা দুরূহ ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে।
খেলাপি ঋণ: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই টাকা ব্যাংকে ঢুকলে এমনিতে তারল্য সঙ্কট কমে যেত এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেত; সুদের হার বাড়াতে হতো না। ২০২২ সালের জুনে ব্যাংকগুলোর কাছে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের জুনে অতিরিক্ত তারল্য কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৬৩০ কোটি টাকায়।
বিশ্বব্যাংক কর্তৃক মূল্যস্ফীতির কারণ বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ার চারটি কারণ চিহ্নিত করেছে। কারণগুলো হলো— (১) অভ্যন্তরীণ জ্বালানির মূল্য বেড়ে যাওয়া; (২) দুর্বল মুদ্রানীতি; (৩) টাকার অবমূল্যায়ন ও (৪) বৈদেশিক মুদ্রা কমে যাওয়া। মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্বনীতি এবং বাজারনীতিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কম্পিটিশন কমিশনকে একই সঙ্গে কাজ করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যা করতে হবে উচ্চ আমদানি কর: বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ার অন্যতম কারণ, উচ্চ আমদানি কর বা ট্যারিফ রেট। যেখানে বর্তমানে বাংলাদেশে গড় ট্যারিফ রেট ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে বিশ্বে গড় ট্যারিফ রেট মাত্র ৬ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে গড়ে ট্যারিফ রেট ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ। মূলত সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ শিল্পগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ট্যারিফ রেট বাড়ানো হয়। ২০২২ সালের মে মাস থেকে ২০২৩-এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এ সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। টিসিবির তথ্য মতে, এ বছরের জানুয়ারি মাসের ৮ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত ১৩টি পণ্যের দাম বেড়েছে। আবার ডলার-সংকটের কারণে আমদানি অত্যধিক ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ভোক্তার ওপর। দুঃখজনক যে, ২০২৩ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম গড়ে ১০ শতাংশ কমেছে, বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য কমেছে ১৪ শতাংশ, পণ্য পরিবহন ব্যয় কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়েনি। আমার মতে, আমদানি কর কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ বাড়াতে পারলে একদিকে মূল্যস্ফীতি কমবে, অন্যদিকে সরকারের করের ভিত্তি মজবুত হবে। অটোমেশন পদ্ধতি চালু করে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। রাজস্বনীতিকে সংস্কার করতে হবে। এ কলামের প্রথমে বলেছি, শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়।
ব্যাংকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা: বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখন তারল্যসংকটে আছে। ব্যাংকের তারল্য সুবিধা প্রদানের জন্য বিশেষ রেপোর হার কমানো হয়েছে। অন্যদিকে রেপো রেট (নীতি সুদহার) বাড়ানো হয়েছে। একদিকে সংকোচনমূলক, অন্যদিকে সম্প্রসারণমূলক সিদ্ধান্ত। নীতি সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা ও নিম্নসীমার মধ্যে ব্যবধান ২০০ শতাংশ পয়েন্ট থেকে কমিয়ে ১৫০ শতাংশ পয়েন্টে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়া হয়। এটা সত্য যে, ডলারসংকটের কারণে ব্যাংকগুলো তারল্যসংকটে পড়ে গেছে। টাকা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। তারল্যসংকটের পেছনে শুধু কি ডলার সংকট দায়ী? অধিকাংশ ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। কৃত্রিমভাবে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
‘ক্রলিং পেগ‘ পদ্ধতি অকার্যকর হবে: সুশাসন নিশ্চিত করা হবে বাংলাদেশের প্রধান কাজ। বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার জন্য মুদ্রানীতিতে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি অনুসরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বলা প্রয়োজন যে, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি থেকে সরে এসেছে। ১৯৯০ সালে ৬৮ শতাংশ উন্নত এবং দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল। ২০০১ সালে এটা কমে ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এরপর তারা ফ্লোটিং রেট গ্রহণ করে। আমার মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য নীতি সুদহার ন্যূনতম ১০ শতাংশ করা দরকার ছিল। মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অর্থনীতিতে অন্যান্য অভিঘাত মেনে নিতে হবে। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ এখন অন্যতম উচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নতুন সরকারের কাছে চাওয়া থাকবে অতিদ্রুত মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে নিম্ন এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষদের বাঁচিয়ে রাখুন।
উপসংহার সর্বোপরি, মুদ্রানীতির সাথে রাজস্বনীতির সমন্বয় থাকতে হবে। একদিকে বেসরকারি খাতের উৎপাদন কাজের ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত করে, বিনিয়োগ কমিয়ে উৎপাদন কমানো হয়। অন্যদিকে, সরকার নিজে মোটা অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করে। ফলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমে না; মূল্যস্ফীতিও কমে না। দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্যও মুদ্রাস্ফীতি ঘটায়, কারণ পণ্যের দাম যতই হোক না কেন, টাকাওয়ালাদের সমস্যা হয় না; বরং সমস্যা হয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের। এমনকি বেসরকারি ঋণপ্রবাহ কমালেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেও ঋণ পেতে বেশি সমস্যা হয়। ফলে তাদের উৎপাদন কমে গিয়ে মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়ায়। সুতরাং কেবল সুদহার বাড়িয়ে নয়; বরং সার্বিক ব্যবস্থা নিয়ে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে হবে; অন্যথায় সারমেয়াদে অর্থনীতি আরো সঙ্কটে আবর্তিত হবে। ড. মো: মিজানুর রহমান লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট। ২১ জানুয়ারি ২০২৪ । সূত্র: নয়াদিগন্ত