★★প্রথমত, বলে নিচ্ছি যে আমি এক টানা ৩৬ টি বিভিন্ন চাকরির প্রিলি পরীক্ষায় ফেল করেছি।
বিভিন্ন চাকরির প্রিলি কিন্তু, বিসিএস প্রিলি নয়। প্রস্তুতি শুরু করার পর বিসিএস মাত্র ৩ টি পেয়েছিলাম।
৩৮ তম বিসিএস, ৪০তম বিসিএস ও ৪১ তম বিসিএস। এর মধ্যে আবার ৪০তম বিসিএস প্রিলি ফেইল করি। আরে ভাই মানুষ এক জীবনে বিসিএস প্রিলি পায় কয় টা বলেন তো????
আর ৩৬ টা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা দিতে ৩৬ বছর লাগে এটা কোন বইয়ে মানুষজন পাইলো বুঝলাম না। এই প্রিলি গুলোর মধ্যে প্রায় সবই ৯ম গ্রেডের ছিল,অল্প কিছু ১০ গ্রেডের ছিল। ২০১৬ সালে আবার বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও ভাইভা দেই এখানেও আমার অনেক সময় নষ্ট হয়। ফেইলের এই সংখ্যা টা আরও বেশি কারন আমি শুধু খাতায় লেখা হিসাবটাই বলেছি। শেষ দিকে আর হিসাব রাখি নি কারণ তখন ফেইলের পাল্লা মারাত্মক ভারী ছিল।
★★ যারা অল্প কিছু চাকরির পরীক্ষা দিয়ে অথবা প্রথম বা দ্বিতীয় বিসিএস এ চাকরি পেয়ে যান বা দূর থেকে দেখেন তাদের কাছে মনে হতেই পারে এই কেমন পরীক্ষার্থী, এর চেয়ে তো আদুভাই ভালো!!!।বলতেই পারেন।
তাদের জন্য একটাই কথা কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার বলে গিয়েছেন–
“”চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন
ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে!
কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে
কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে””।
যে এক টানা প্রিলি পাস করতে পারে না, তার কষ্ট এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যক্তি ছাড়া কেউই বুঝবে না।
দ্বিতীয়ত, নিউজ হওয়া গল্পে যতটুকু আপনারা জেনেছেন এই গল্পটুকু আসলে আমার স্ট্রাগলের ১০০ ভাগের মধ্যে ১০ ভাগ মাত্র।
কতটা সংগ্রাম, কতটা কষ্ট আমি করেছি তা শুধু আমার পরিচিত অল্প কিছু মানুষই জানে।
★★কিছু কথা ও কিছু ধৈর্যের পরীক্ষার গল্প :
৩৮তম বিসিএসের প্রিলির রেজাল্ট তখনো হয় নি। ঢাকায় থাকার জন্য কত হোস্টেল খোঁজলাম। আজিমপুর থেকে ফার্মগেট হেটে হেটে হোস্টেল খোঁজলাম কিন্তু বেশির ভাগ হোস্টেলেই থাকা-খাওয়ার খরচ অনেক বেশি,আরো সমস্যাও ছিল তাই উঠতে পারছিলাম না। অনেক খোঁজার পার Moni Bhowmik Smriti দির (আমার কলেজের সিনিয়র) সাথে দেখা, দিদি বলল তার হোস্টেলে একটা সিট এর ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। সিট ভাড়াও কম।
দিদির সাথে হোস্টেলে গিয়ে রুম পছন্দ করলাম।
যেহেতু, রাত জেগে পড়ি তাই সিঙ্গেল রুম নিলাম। মূলত, হোস্টেলটা একটা Flat বাসা। আর অই সিঙ্গেল রুমটা হল একটা কিচেন রুম। রুম টা ৪ ফিট /৮ ফিট ছিল। ছোট একটা চৌকি পাতা ছিল রুমে। আর কোনো জায়গা ছিল না। রুমে ঢুকতে হলে দরজা দিয়ে সরাসরি চৌকিতে উঠতে হত। বই খাতা রাখতাম চুলা রাখার জায়গায়। যে জানালা ছিল তা খোলা যেত না। আমার রুমে যে আসতো,সেই বলতো এটা একটা কবরখানা।
অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার পরও আমার পড়াশোনা কমে নাই বরং আরো মোটিভেশন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম।
সময় যেতে লাগলো,চাকরির প্রিলি গুলো ফেইল করতে থাকলাম। হোস্টেলের অনেকে বলাবলি করতো, এতো পড়েও চাকরি হয় না,আমার জীবনেও চাকরি হবে না।
গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমি সৃষ্টিকর্তার নিকট দুই হাত তুলে শুধু কান্না করতাম। আর শুধু বলতাম একটা সম্মানজনক চাকরির ব্যবস্থা তুমি করে দাও। এমন কোন রাত নেই যে রাতে আমি সৃষ্টিকর্তার নিকট দুই হাত তুলে চোখের জল ফেলি নি।
একবার দুই মাসের হোস্টেল ফি বাকি পরলো। বাবার হাতে টাকা ছিল না তখন। মূলত বাবা জমি বিক্রি করতে পারছিলো না। হোস্টেল কর্তৃপক্ষকে বললাম যে টাকা টা দিতে একটু দেরি হবে। একটু যেন কনসিডার করে। কি আর কনসিডার!!!! এরপর থেকে যখনই ভাত খেতে যেতাম খাওয়া অবস্থাই হোস্টেল সুপার যে কত কথা শুনাইত–হোস্টেলের ফি দিচ্ছি না, কেন খাবার খাই। ফি না দিয়ে খাচ্ছি, লজ্জা নাই আমার!!!কত বার যে নিরবে চোখের জল ভাতের থালাতে পরেছে!!!!
এই অপমানের ভয়ে হোস্টেলের ডাইনিং এ খাবার খেতে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। মানুষ তো!! ক্ষিধে তো লাগে। রুমে মুড়ি ছিল টানা ৪ দিন দিন শুধু মুড়ি আর পানি খেলাম। যে এসে জিজ্ঞেস করতো খাবার খেয়েছি কি না,বলতাম খেয়েছি। লজ্জায় বলতে পারতাম না কোন কিছু। মুড়ি খেয়ে ক্ষুধা আমার কিছুতেই মিটে না।
জীবনে প্রথম বুঝলাম ভাতের কষ্ট কি জিনিস। এই দিকে ক্ষিধে নিয়ে পড়তেও পারছিলাম না ঠিক মত।
৪ দিন পর বাবা ৫০০ টাকা পাঠালে আনন্দ সিনেমা হলের পাশের হোটেল থেকে ২৫ টাকার সবজি ভাত খেলাম। আবারও জীবনে প্রথম বারের মতো ভাতের মূল্য বুঝতে পারলাম।
এক সময় মাকে খাবারে জন্য অনেক জ্বালাতন করেছি। এটা খাবো না, ওটা খাবো না। ভাতের থালাও ঠেলে ফেলে দিয়েছি অনেক সময়। এটাও বুঝলাম সৃষ্টিকর্তা শাস্তি টা একদম সঠিক সময়ে দিয়েছেন।
একমাস পর হোস্টেল ফি দিয়ে দিলাম।
এই কবরখানায় পড়াশোনা করে জীবনের প্রথম চাকরি পেলাম। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেসিপে ডিস্ট্রিক্ট ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর হিসেবে। এটাও বুঝলাম সৃষ্টিকর্তা কোনো পরিশ্রমী কেই খালি হাতে ফেরান না কখনো। সবার প্রাপ্তির সময় আলাদা আলাদা হয়।
বি:দ্র: এই যে এখন বিপিএটিসি তে ট্রেনিং করছি, ৫ বেলা খাবার, এসি রুম কত কি!!!যতবেলা খাবার খাই তত বারই শুধু আমার অতীত মনে পড়ে। আর সৃষ্টিকর্তার নিকট বিনম্র মস্তকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
আমি জানি এর চেয়েও বেশি কষ্ট করেও অনেকে চাকরি পেয়েছে তাদের প্রতি অনেক সম্মান প্রদর্শন করছি। সবারই আলাদা গল্প থাকে। এমন সংগ্রামীরা বিজয়ী হোক এটাই প্রার্থনা করি। আমি বিশ্বাস করি, যে কোন কাজে,ধৈর্য ধরে লেগে থাকলে সফলতা আসবেই।
আর সৃষ্টিকর্তা যখন পারফেক্ট সময় মনে করবেন ঠিক তখনই আপনাকে লক্ষ্যে পৌঁছাবেন, ওই সময়ের আগেও না পরেও না।
আমার এই লেখা থেকে একজনও যদি অনুপ্রাণিত হয়,তবে সেটাই আমার সার্থকতা।