ভূমিকা
০৯ নভেম্বর ১৯৮৯, বিভক্তির প্রতীক বার্লিন দেয়াল ভেঙে দুই জার্মানি একত্র হয়। সমাজতান্ত্রিক আদর্শ পুঁজি করে গড়ে ওঠা সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক আধিপত্যের পতন ঘটে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান পশ্চিমা পক্ষের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতি পরিক্রমায় একচ্ছত্র ক্ষমতা বিস্তারের সুযোগ করে দেয়। সময় বয়ে চলে। প্রথম গালফ (১৯৯০), আফগান (২০০১)- ইরাক (২০০৩) যুদ্ধ ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে (২০১১) যুক্তরাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণ শক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে, একই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছু দেশকে নিজের সীমারেখার বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে শক্তিশালী হতে উদ্বুদ্ধ করে।
ইউনিলেটারিজম টু মাল্টিলেটারিজম
ভারত, চীন, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাপানের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো এবং রাশিয়ার মতো পারমাণবিক ক্ষমতাধর আঞ্চলিক শক্তি, আন্তর্জাতিক পরিক্রমায় ক্ষমতা প্রদর্শন শুরু করে। বস্তুত, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ক্রমেই চীনের মত আঞ্চলিক শক্তিকে বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভের (বি.আর.আই.) মতন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত একটি আন্তর্জাতিক মডেল বা পরিকল্পনা প্রণয়নে সাহায্য করে। উল্লেখ্য, বি.আর.আই. মডেল বাস্তবায়নে চীনকে নিজের আঞ্চলিক গণ্ডির বাহিরে তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে হয়। এই বৃদ্ধিকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ভারত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অংশীদার যথাঃ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে। এভাবেই আন্তর্জাতিক পরিক্রমায় যুক্তরাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থ বিবেচনার বদলে বহুপক্ষের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা প্রধান হয়ে উঠে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিক্রমার এই পরিবর্তন কে পাঠ্যপুস্তকের ভাষায় ইউনিলেটারিজম টু মাল্টিলেটারিজম বলা হয়ে থাকে ।
ভূরাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত সমীকরণ
ভারত মহাসাগরকে আমেরিকার প্রখ্যাত সমরকৌশলী রবার্ট ডি কাপলানের বিখ্যাত মনসুন: ইন্ডিয়ান ওশান এন্ড দ্যা ফিউচার অব আমেরিকা গ্রন্থে আগত শতকের (একবিংশ শতক) রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্র হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, একবিংশ শতকের শুরুতেই সে আলামত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বস্তুত, বিংশ শতকের ভূরাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষত স্নায়ুযুদ্ধের ইতিহাস বাদ দিলে ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। বাণিজ্য, যোগাযোগ, সমুদ্র সংলগ্ন জীবিকা প্রভৃতি কারণে ভারত মহাসাগর বৈশ্বিক ইতিহাসে অন্যতম তাৎপর্যে ভরা এক জলসীমা। আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ও তার আহরণ, নিরাপদে জ্বালানি পরিবহন, অত্যাধুনিক নৌশক্তি গঠন, এবং সমুদ্রযাত্রা পথকে ঝুঁকিমুক্ত রাখা একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জিং অন্যদিকে আকর্ষণীয়!
চীন-ভারত দ্বৈরথ
যাহোক, ভারত মহাসাগরে চীন-ভারত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ নিজেদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে ঘিরে সীমান্ত পাওয়া এই দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির নির্ধারণ ও কিছু ভূখণ্ডের (যেমন: লাদাখ, তিব্বত, দোখলাম, সিকিম প্রভৃতি) উপর ধারাবাহিক সংকট ও সংঘাত আরও জটিল রূপ নিয়েছে। উল্লেখ্য, এই জটিল সংকট শুধু ভূমিবেষ্টিত থাকে নি। উপরুন্তু ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংকটকেও ঘনীভূত করছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সামরিক (নৌ) উপস্থিতি এবং এই অঞ্চলকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও কাঠামোগত পরিকল্পনাকে ভারতীয় প্রান্ত-নির্ধারকেরা ভারতের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা প্রেক্ষিতে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
চীনের “স্ট্রিং অব পার্লস” পরিকল্পনা ভারতের ভাষায়, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমাগত প্রভাব বিস্তার এই অঞ্চলের আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের সম্ভাবনাকে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত করেছে। তাই, চীনের উপস্থিতির বিপরীতে ভারতও নিজেকে এই মহাসাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার (ভারতের ভাষায় সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ক্ষমতা প্রদর্শনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। ফলে, ভূরাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত দিক বিবেচনায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক নতুন রাজনৈতিক (নিও- রিয়েলপলিটিক) পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চীনের নিজের অর্থনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তিকে টেকসই করার অভিপ্রায় ২০১৩ সালে বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বি.আর.আই.) পরিকল্পনা ঘোষণা করে। বি.আর.আই. পরিকল্পনা চীনকে সমগ্র বিশ্বে, বিশেষত এশিয়া মহাদেশে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশই বি.আর.আই. -এর সদস্য হয়েছে এবং অনেকেই সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বি.আর.আই. পরিকল্পনার কৌশলগত একটি অংশ “স্ট্রিং অব পার্লস বা মুক্তামালা”। অনেক বিশারদ, চীনের এই নতুন সামুদ্রিক পরিকল্পনাকে চীনের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক/ ভূ- রাজনৈতিক পরিকল্পনার একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, এবং তাদের ভাষায় এই কৌশলগত পরিকল্পনার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল অধিকিন্তু, এই অঞ্চলের জনসংখ্যা, বিরাট বাজার, ভৌগোলিক অবস্থান প্রভৃতি চীনের “স্ট্রিং পার্লস” পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অতি জরুরি। এই পরিকল্পনার পথ ধরে চীন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর রাজনৈতিক সমর্থনের লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। বিপরীতে, এই অঞ্চলের, বিশেষত ভারত ছাড়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলীয় দেশগুলোয় চীন সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার হয়ে উঠেছে এবং পাশাপাশি কৌশলগত দিক বিবেচনায়ও চীনের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
এছাড়াও, ভারত মহাসাগর চীনের বাণিজ্য পরিচালনা ও জ্বালানি পরিবহনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। সে বিবেচনায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তার দিকটি চীনকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ দাবী করেন, এবং তারা বলেন, চীনের বাণিজ্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে যেকোনো ধরণের ঝুঁকি থেকে বাচাতে ইন্দো- প্যাসিফিক অঞ্চলে পূর্বের তুলনায় অধিকহারে চীনের সামরিক উপস্থিতি প্রতীয়মান হচ্ছে। এছাড়াও, চীনের বি,আর.আই. পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য মালাক্কা প্রণালীর উপর চীনের নির্ভরশীলতা কমানো বা মালাক্কা সংকট থেকে বাচা, এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চীনা স্থলসীমান্তবর্তী দেশের (যেমনঃ মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস প্রভৃতি) মধ্যদিয়ে চীনের ভূখণ্ডকে ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করা। এ লক্ষ্য পূরণে চীন ভারত মহাসাগরীয় অনেক দেশের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, সমুদ্র বন্দর ও সাবমেরিন স্টেশন তৈরি সহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহায়তা করছে।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ভারতের গুরুত্বারোপ
ভারতের বৈদেশিক নীতিতে বিশেষত একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ভারত তার নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতিকে ভারত তার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বলয়ে চ্যালে ভারত মহাসাগরকে ভারত অধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। স্বাভাবিক কারণেই ভারত মহাসাগর হিসেবে গ্রহণ করছে। ভারতের ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক কৌশল উল্লেখ করেন যে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তার রোধে ও সামগ্রিক নিরাপত্ত বিশ্লেষণে সাউথ এশিয়ান ভয়েজ পত্রিকায় দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. পূজা ভার বজায় রাখতে, ভারত প্রধানত তিনভাবে কাজ করছেঃ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে সামরিক প্রভাব বিস্তার; আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের সহযোগে এর মহাসাগরীয় অঞ্চলের সুবিধা লাভ ও সমন্বিতভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা; এবং স্থানীয় পর্যায়ে নৌ বাহিনীকে একটি শক্তিশালী বাহিনীতে রূপ দিতে ভারত তার বার্ষিক বাজেটের একটি বড় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দরুন আঞ্চলিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক সময়ে, ভারতীয় অংশ ব্যয় করে। এছাড়াও, নিজস্ব প্রযুক্তিতে ভারত বিভিন্ন যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ করেছে, ভারতের লাক্ষ্মাদ্বীপে আইএনএস জটায়ু, মরিশাসের এগেলেগা দ্বীপে আইএনএস কদম্ব নৌ- ঘাটি স্থাপন করেছে যাতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতীয় নৌ প্রভাব অনেক কার্যকরী হতে পারে।
অধিকন্তু, ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে ভারত আন্তসীমান্ত বা ট্রান্সন্যাশনাল হুমকিগুলোকে (যেমনঃ অবৈধভাবে মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, মানব ও মাদক পাচার, অবৈধ অভিবাসন, সংঘবদ্ধ অপরাধ (অস্ত্র চোরাচালান), জলদস্যু ও সামুদ্রিক সন্ত্রাসবাদের বিস্তার, সামুদ্রিক পরিবেশগত ক্ষত ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যেহেতু এই ঝুঁকির বিস্তৃত রূপ ভারতকে এই অঞ্চলের অন্যান্য অংশীদারদের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই লক্ষ্যে মিলান, মালাবার, আসিয়ান ইন্ডিয়া ইত্যাদি শিরোনামে ভারত নৌ মহড়ার আয়োজন করে। এছাড়াও, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও ভারত নৌ মহড়া সহ সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবর্তিত ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে ভারত নিজেকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্ত নিশ্চিতকরণের প্রধান শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে, এবং তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ভারতের ভূমিকাকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করে ভারতকে সাথে নিয়ে ইন্দো- প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমাগত প্রভাব বিস্তারকে রুখে দিতে চায়, যার ফলাফল হিসেবে কোয়াড ও অউকাস নামক সামরিক জোট গঠিত হয়।
উপসংহার
চীন-ভারত দ্বৈরথ স্থলসীমানা ছাড়িয়ে এখন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে। এই দ্বৈরথে আঞ্চলিক শক্তি দুইটির বাহিরেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সংযুক্তি ভারত মহাসাগরের ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত বাস্তবতায় নয়া সমীকরণ তৈরি করবে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশারদদের ধারণা।
লেখকঃ বদিরুজ্জামান, গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ মেরিটাইম রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট (বিমরাড)। ১৫ আগস্ট ২০২৪। সূত্র: কালবেলা ।