চীন থেকে বিনিয়োগ বিডার তথ্যে জানা যায়, ২০১৪ সালে চীন থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ এসেছিল ৩৭ দশমিক ২২ মিলিয়ন ডলার, ২০১৭ সালে এসেছিল ৯০ দশমিক ১২ মিলিয়ন, ২০১৮ সালে এসেছিল ১০২৯ দশমিক ৯০ মিলিয়ন, ২০১৯ সালে এসেছিল ৬২৫ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার। এরপরই ধাক্কা আসে করোনার। তাই ২০২০ সালে চীনা বিনিয়োগ কমে হয় ৯১ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলার। তবে পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ সাল থেকেই পরিস্থিতি আবার ভালো হতে শুরু করে। এ বছর দেশে চীনা বিনিয়োগ এসেছে ৪০৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারের। সর্বশেষ ২০২২ সালে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আসে ৫২৫ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলারের।
চীনা বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়াতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে তোলা হচ্ছে চীনা ইকোনমিক জোন। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। শুরু থেকে এই ইকোনমিক জোনের কাজ প্রায় চার বছর বন্ধ ছিল। তবে ইদানীং এই ইকোনমিক জোন প্রস্তুতের কাজে বেশ গতি এসেছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেজা অফিসে বেজার চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতও ছিলেন। রাষ্ট্রদূত বৈঠকে বলেছিলেন, চায়না ইকোনমিক জোনের কাজ শুরু করা দরকার। তিনি বলার পর বাংলাদেশ-চায়না চেম্বারের পক্ষ থেকেও জোর দিয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয় ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বারের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন মৃধা বলেছিলেন, ‘বেজার সঙ্গে বৈঠকে আমরা বলেছিলাম ইকোনমিক জোনের কাজ শুরু করতে দেরি করা ঠিক হচ্ছে না। এতে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হবে। ইকোনমিক জোনটির উন্নয়ন কাজের জন্য প্রথমে চায়না হারবার নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঠিক করা হয়েছিল। পরে তাকে বাদ দিয়ে নতুন কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন বেশ জোরেশোরে কাজ চলছে। আশা করছি আগামী বছর নাগাদ চায়না ইকোনমিক জোনটি উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের উপযোগী করে তোলা যাবে। এটা প্রস্তুত হয়ে গেলে চীন – থেকে ব্যাপক বিনিয়োগ আসবে বাংলাদেশে। মূলত গার্মেন্টস খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিে পণ্য তৈরির কারখানা করা হবে বেশি। এর ফলে এ শিল্পের যেসব ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ পণ্য ‘চীন থেকে আমদানি করা হয় তখন সেগুলো এই ইপিজেড থেকেই পাবেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা।
চায়না ইকোনমিক জোনের সম্ভাবনা ও সুযোগ চায়না ইকোনমিক জোন হলে একদিকে যেমন সে দেশের প্রচুর বিনিয়োগ আসবে, অপরদিকে তারা যেসব উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন করবে সেগুলো দেশের মানুষ কম মূল্যে কিনতে শুধু ইকোনমিক জোনেই কর্মসংস্থান হবে বাংলাদেশী ১ লাখ লোকের। ১ লাখ লোকের পারবে। সবচেয়ে বড় কথা- তারা শিল্প গড়লে বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হবে। এতে দেশের রপ্তানি আয় আরও বেড়ে কর্মসংস্থান হওয়া মানে ৫ লাখ লোক সরাসরি এর মাধ্যমে উপকৃত হবে। এছাড়াও এই ফোনে রপ্তানি করছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। বেপজার ১০০ ভাগ বিনিয়োগকারীর মধ্যে শুধু চীনের যাবে। বেপজার যেসব এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন রয়েছে সেগুলোতে কিন্তু সবচেয়ে বেশি। হিস্যা হবে ৪০ ভাগ। এখনো বেপজায় যত বিনিয়োগ আসছে তার সিংহভাগই চীনা বিনিয়োগ। বেপজায় বেশি প্ল্যান্ট নিচ্ছেন চীনা উদ্যোক্তারা। সামনের বছরগুলোতে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে আরও অনেক বাড়বে।
জটিলতা দূর করতে হবে বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে বিড়ম্বনা ও সেবার মান কম হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই হতাশ হয়ে পড়েন। বন্দরে ভোগান্তির নামে কর্মকর্তাদের ঘুষ বাণিজ্য, ঘুষ না দিলে নানা রকম হয়রানি। ইচ্ছাকৃতভাবে এইচএস কোডের জটিলতা তৈরি করে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হয়। এগুলো আমাদের অনেক পিছিয়ে দিচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। চাইনা বিনিয়োগকারীরাও এসব বিড়ম্বনায় বিরক্ত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বন্দরের বিড়ম্বনায় বিরক্ত হয়ে ইতোমধ্যেই বড় কিছু বিনিয়োগ প্রস্তাব বাংলাদেশ থেকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডে সরে গেছে। সুতরাং দেশের ভালো চাইলে, দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে এবং দূর করতে হবে বন্দরের বিড়ম্বনা।
চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্র বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সূত্রে জানা গেছে, চীনা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের বড় আগ্রহের জায়গা হচ্ছে গার্মেন্টস খাত। ৭০ শতাংশ বিনিয়োগই তারা গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে করছে এবং আগামীতেও করতে চায়। এর বাইরে তারা ফুটওয়্যার, লেদার, ইলেকট্রনিক্স খাত, খেলনা তৈরি শিল্প ও প্লাস্টিক শিল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এখন তারা বাংলাদেশের এসএমই খাতেও ব্যাপক বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে। এসএমই খাতে যে ধরনের মেশিনারিজ, কাঁচামাল দরকার সেগুলোতে তারা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
চীন বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যের দীর্ঘদিনের যে ইতিহাস তার মধ্যে এখন দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে। চীনের কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী গত বছর চীনবাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলারের। ২০০২-০৩ অর্থবছরেও এই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল ২ বিলিয়ন ডলারের কম। গত ২০ বছরে ২ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখন ২৫ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীন থেকে আমদানি করছে। আর বাংলাদেশ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি পণ্য চীনে রপ্তানি করা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বাণিজ্যিক দিক থেকে চিন্তা করলে এখন সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য।
চীনা বাংলাদেশ বাণিজ্যে ঘাটতির কারণ চীন বেশি রপ্তানি করছে, আর বাংলাদেশ সে দেশে কম রপ্তানি করছে। এর পেছনে অবশ্য কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল। সারাবিশ্বে এখন প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও ওষুধ শিল্পের যে কাঁচামাল দরকার হয় তার ৮০ শতাংশই আমদানি করা হয় চীন থেকে। কাচামাল, মেশিনারিজ, এক্সেসরিজ, কেমিক্যাল, টেকনোলজি এগুলো চীন থেকেই বেশি আমদানি করা হচ্ছে। এসব পণ্য চীন থেকে এনে তার সঙ্গে ভ্যালু অ্যাড করে সেটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। মূলত এই কারণেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেশি। এর বাইরে ইলেকট্রনিক্স খাতের বড় অংশই আমদানি করা হচ্ছে চীন থেকে। দেশে এখন বাংলাদেশী ব্র্যান্ড নামে যেসব ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তারাও তাদের শিল্পের কাঁচামাল ও মেশিনারিজের সিংহভাগই আমদানি করছে চীন থেকে। শুধু বাংলাদেশের সঙ্গেই নয়, বিশ্বের ৮০টি দেশের সঙ্গে চীন হচ্ছে শীর্ষ বাণিজ্য সহযোগী দেশ। বেশিরভাগ দেশেরই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় এরকম।
চীনা বাজারের সম্ভাবনা বিশ্ব বাজারে আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য গার্মেন্টস। চীনও বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। তারা নিজেদের ১৩০ কোটি মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের পোশাক সরবরাহ করছে। চীন আবার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানিও করে। এই ১০ বিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের শেয়ার খুবই কম। চীনের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি খুব বেশি বাড়বে সেটি বলা যাবে না। তবে চীনে চামড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং আমাদের দেশের চামড়া অনেক উন্নতমানের। সেখানে চামড়া ও চামড়াজত পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। চীন কিন্তু বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। শুল্কমুক্ত সুবিধাই হচ্ছে চীনে বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর বড় হাতিয়ার এবং এর মাধ্যমেই চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব। আমাদের ওষুধ শিল্পেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে চীনে। বিশেষ করে বাংলাদেশে উৎপাদিত ক্যান্সারের ওষুধের চাহিদা রয়েছে চীনে ।
উপসংহার মূলত চীন বাংলাদেশী পণ্যের বড় বাজার হতে পারে। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য যা যা করা দরকার তা করতে হবে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ১২ নভেম্বর ২০২৩। ড. মোঃ জাহাঙ্গির আলম। লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক-বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোং লি.। সূত্রঃ জনকণ্ঠ।