মধ্যম আয়ের দেশ ও এলডিসির তফাৎঃ
বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বের দেশগুলোকে তাদের আয় এবং সামাজিক কিছু সূচকের ভিত্তিতে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে থাকে। এগুলো মধ্যে বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘ আলাদা আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। বিশ্বব্যাংক ঋণ প্রদানের সুবিধার জন্য অ্যাটলাস মেথড নামক বিশেষ পদ্ধতিতে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (GNI) পরিমাপ করে। একটি দেশের স্থানীয় মুদ্রায় মোট জাতীয় আয়কে মার্কিন ডলারের বিপরীতে হিসাব করা হয় এক্ষেত্রে তিন বছরের গড় বিনিময় হারকে সমন্বয় করা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওঠা-নামার সমন্বয় সম্ভব হয়। প্রতি বছর ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় অনুসারে দেশগুলোকে ৪টি ক্যাটাগরীতে ভাগ করে । এগুলো হলো-
| ক্যাটাগরি | GNI/ Capita (USD) |
| নিম্ন আয়ের দেশ | ১০০৫ এর কম |
| নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ | ১০০৬-৩৯৫৫ |
| উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ | ৩৯৫৫-১২২৩৫ |
| উচ্চ আয়ের দেশ | ১২২৩৫ এর বেশী |
The World Bank Data Blog, New country classifications by income level: 2017-2018 বিশ্বব্যাংক প্রতিবছর এই তালিকা নতুন করে তৈরি করে। তবে এই ভাগটি শুধু আয়ভিত্তিক বলে এখানে কোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্রটি বোঝা যায় না। কেননা, উচ্চ মাথাপিছু আয় থাকার পরও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক দেশ সামাজিক সূচকে পিছিয়ে থাকে । তাই জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছে:- স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাউন্সিল (ECOSOC) এর উন্নয়ন নীতিমালাবিষয়ক কমিটি (CDP) তিনটি সূচকের ভিত্তিতে তিন বছর পর পর স্বল্পোন্নত দেশবা এলডিসির তালিকা তৈরি করে থাকে ।
LDC বা স্বল্পোন্নত দেশঃ যেসব দেশ সুনিয়ন্ত্রিতভাবে দারিদ্র্য হার কামানোর ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনে ব্যর্থ এবং যে সকল দেশের জীবনযাত্রার মান কম ও মানব উনয়ন সূচক অপরাপর দেশের তুলনায় নিম্নমূখী সেগুলো স্বল্পোন্নত দেশরূপে চিহ্নিত। ঐ সমস্ত দেশগুলোকেই স্বল্পোন্নত দেশ বলা যায় যেগুলো তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে উল্লেখযোগ্য হারে শিল্পখাতের প্রসার ও উনয়ন ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐ সকল দেশের জীবনযাত্রার মান নিম্নমানের হয়ে থাকে। নিম্নমুখী আয় এবং উচ্চমুখী জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে স্বল্পোন্নত দেশের গভীরতর সম্পর্ক বিরাজমান।
LDC নির্ণায়কঃ ১৯৭১ সাল থেকে জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশসমূহকে LDC ভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে সেই সব রাষ্ট্রসমূহকে যারা উন্নয়ন পক্রিয়ায় ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক এবং কাঠামোগত কারনে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (UNCTAD) সর্বপ্রথম ২৫টি দেশকে তালিকাভুক্ত করে ১৮ নভেম্বর, ১৯৭১ সালে LDC তালিকা প্রনয়ণ করে। এক্ষেত্রে জিডিপি ও শিক্ষার হার ছিল LDC নির্ণায়কের মাপকাঠি। পরবর্তীতে মানব উন্নয়ন সূচক ও অর্থনীতির নাজুকতার সূচকও মাপকাঠি হিসেবে গৃহীত হয়। বর্তমানে ৩টি শর্তপূরণ সাপেক্ষে একটি দেশকে LDC ভুক্ত ঘোষনা করা হয়-
১.দারিদ্র সূচক- মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (GNI) ১০২৫ মার্কিন ডলার বা তার চেয়ে কম।
২.অর্থনীতি ভঙ্গুরতার সূচক (EVI)-স্কোর ৩৬ বা এর বেশি । অস্থিতিশীল কৃষি উৎপাদন
অস্থিতিশীল রপ্তানি (পণ্য ও সেবা)
দুর্বল অর্থনীতি
৩.মানব উন্নয়ন সূচক (HAI)-স্কোর ৬২ বা এর কম
অপুষ্টির শিকার এমন জনসংখ্যার আধিক্য
অধিক মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার
শিক্ষা ও সাক্ষরতার স্বল্প হার
LDC অভিগমনের শর্ত ও বাংলাদেশের অর্জনঃ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC) এর উনয়ন নীতি কমিটি (CDP) তাদের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনার মাধ্যমে LDC তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্য দেশের তালিকা প্রকাশ করে। LDC থেকে উত্তরণের ক্ষেত্র বিবেচা সূচক হচ্ছে ৩টি-
1. তিন বছরের গড় মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (GNI) ।
2. পুষ্টি, স্বাস্থ্য, স্কুলে ভর্তি ও সাক্ষরতার হারের সমন্বয়ে তৈরি মানব সম্পদ সূচক (HAI) ।
3. জনসংখ্যা, কৃষি উৎপাদন, পণ্য রপ্তানি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক (EVI) ।
এই তিনটি সূচকের যে কোন ২টি অর্জন করতে পারলেই একটি দেশ LDC তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। তবে শুধু মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের ভিত্তিতেও একটি দেশ LDC থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে যদি মূল্যায়নের বছরে ঐ দেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় নির্ধারিত প্রয়োজনীয় আয়ের দ্বিগুণ, অর্থাৎ ২,৪৬০ মার্কিন ডলার বা তার থেকে বেশি হয়।
এলডিসি থেকে উত্তরণের শর্ত মাথাপিছু আয় হিসাবটি জাতিসংঘ করেছে এটলাস পদ্ধতিতে। সেখানে মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করে তিন বছরের গড় হিসাব করা হয়। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী উত্তরণের শর্ত ও বাংলাদেশের অবস্থা বর্ণনা করা হলো।
| শর্তসমূহ | মানদন্ড | বাংলাদেশের |
| মাথা পিছু আয় | ১২৩০ ডলার | ২০৬৪ ডলার |
| মানব সম্পদ | ৬৬ বা তার থেকে বেশী স্কোর | ৭৫ দশমিক ৪ স্কোর |
| অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা | ৩২ বা তার থেকে কম স্কোর | ২৫ দশমিক ২ স্কোর |
সিডিপি কী
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) একটি সহযোগী ফোরাম হলো কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। এই কমিটি কোন কোন দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হবে, তা প্রাথমিকভাবে ঠিক করে থাকে। এ জন্য তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মূলত পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, মানবসম্পদ এবং মাথাপিছু আয়-এই তিনটি সূচকের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়। কোনো দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার জন্য সিডিপি প্রথমে ইকোসকে সুপারিশ পাঠায়। এরপর ইকোসক তা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অনুমোদনের জন্য পাঠায় একটি দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার সুপারিশ পেতে পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে নির্ধারিত তিন সূচকের নির্দিষ্ট মান অর্জন করতে হয়। যেকোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার দ্বিগুণ করতে হয়। সিডিপির সদস্যসংখ্যা ২৪। বাংলাদেশকে ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। তবে বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ পর্যন্ত সময় নিয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় বাংলাদেশঃ ২০২১ সালে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (CDP) আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সকল মানদন্ড পূরণকারীদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কোনো দেশ প্রথমবার LDC থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করার পরেও আরো ছয় বছর এই উন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হয়। LDC তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে উন্নীত হওয়ার যে মূল্যায়ন, তার দায়িত্ব দেওয়া হয় জাতিসংঘের দুটি সংস্থাকে-
-জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (UNCTAD) এবং
– জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাগ (UNDESA)
উত্তরণের শর্ত ও মানদন্ড – যেভাবে উত্তরণ ঘটে
“দুভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ অর্জন করা যায়। প্রথমত, যে কোনো দুটি শর্ত প্রতিপালন করলে। দ্বিতীয়ত, শুধু মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হলে অর্থাৎ ১২৩০ মার্কিন ডলারের দ্বিগুণ ২৪৬০ মার্কিন ডলার হলে ।
বর্তমান সরকারের মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবার পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৮ সালের মার্চ মাসে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হবার সব শর্ত পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবার জন্য প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হয়েছিলাম। সে সময়কার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১২৭৪ মার্কিন ডলার, মানব সম্পদ সূচকের মান ৭৩.২ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের মান ২৫.২ ছিল। সাধারণত উত্তরণের বিষয়টি প্রতি তিন বছর পরপর জাতিসংঘের *Committee for Development Policy (CDP)’ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করে ।
-এ সিডিপির চূড়ান্ত সুপারিশের তিন বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তখন বলা হয়েছিল, ২০২১ সাল পর্যন্ত এ অর্জনগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসার বিষয়ে অনুমোদন পেতে হবে। কিন্তু কোভিড-১৯ বিবেচনায় প্রস্তুতি নিতে বাড়তি দু’বছর সময় দেওয়া হয়েছে। তাই অন্তবর্তীকালীন প্রস্তুতি হিসেবে তিন বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছর সময় পাওয়া গিয়েছে। উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমাদের চড়ান্ত উত্তরণ ঘটবে। ২০২০ সাল শেষে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় (জিএনআই) ১৮২৭ মার্কিন ডলার, মানব সম্পদ সূচকের মান ৭৫.৩ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের মান ২৭.৩।
এলডিসি থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ
LDC থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের সম্ভাবনা :
*স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়বে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আমরা এক কাতারে দাঁড়াতে পারব।
*স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সকল মানদন্ড পূরণকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশকে এখন আন্তর্জাতিক ফোরামে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হবে ।
*আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক ক্ষেত্রে এদেশের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে ।
*অর্থনৈতিক ভঙ্গুগুরতা সূচক ও মানব সম্পদ উনয়ন সূচকে বাংলাদেশের ভাল অবস্থান থাকার স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমান বৃদ্ধি পাবে । বাংলাদেশ ২০২৭ সাল পর্যন্ত ইউরোপিয় ইউনিয়ন (EU) এর Everything But Arms (EBA) সুবিধার আওতায় রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানির সুবিধা পাবে। এছাড়া, বাংলাদেশ মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইউরোপিয় ইউনিয়নের প্রযোজ্য শর্তাবলী পূরণ করতে পারলে জিএসপি প্লাস নামে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা পাবে।