ভূমিকা কয়েক মাস আগে আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য যে ভিসানীতি ঘোষণা করেছিল, সেই নীতি আমেরিকা এখন কার্যকর করেছে মর্মে সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে। আর সেই সঙ্গে আমাদের দেশেও ভিসানীতি এবং স্যাংশনের বিষয় একত্রে মিলিয়ে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। আমেরিকার ভিসানীতি মোটেই নতুন কিছু নয়। আমেরিকা কখনো ওপেন বা উন্মুক্ত ভিসানীতি অনুসরণ করে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পলিসি
তাদের ভিসানীতির বৈশিষ্ট্যই এমন। যাদের ভিসা দিলে তাদের কাজে আসবে, তারা শুধু তাদেরই ভিসা দিয়ে থাকে। অন্য কাউকে তারা কখনো ভিসা দেয় না, তা তিনি যে মাপের মানুষই হোন না কেন। এখন কানাডা থেকে আমেরিকার ভিসা পেতে হলে ভিসার জন্য আবেদন করে প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমেরিকার মতো প্রযুক্তিতে সেরা দেশের ভিসা প্রতিবেশী দেশ কানাডা থেকে সংগ্রহ করতে এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার কি কোনো যুক্তিসংগত কারণ থাকতে পারে? আসলে এভাবে ভিসা দেওয়ার বিষয়টিও আমেরিকার এক ধরনের ভিসানীতি ।
ভিসা বনাম স্যাংশন আমেরিকার ভিসানীতি এবং স্যাংশন একত্রে মিলিয়ে এখন নানামুখী আলোচনা চলছে। আমেরিকার ভিসানীতি এবং স্যাংশন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো প্রক্রিয়া। ভিসানীতি প্রয়োগ করা হয় আমেরিকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে। পক্ষান্তরে আমেরিকার স্যাংশন প্রয়োগ করা হয় কোনো দেশের, ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বা ব্যবসা-বাণিজ্যকে সীমিত করার উদ্দেশ্যে। সুতরাং আমেরিকার ভিসানীতি এবং স্যাংশন সম্পূর্ণ দুটো ভিন্ন বিষয় এবং এর প্রয়োগ ও কার্যকারিতাও ভিন্ন। তবে এই দুটোর মধ্যে সূক্ষ্ম একটা সম্পর্ক আছে। আমেরিকার যে ভিসানীতিই বলবৎ থাকুক না কেন, যাদের বা যে প্রতিষ্ঠানের ওপর স্যাংশন আরোপ করা হবে, তারা সাধারণ নিয়মে আমেরিকার ভিসা পাবে না। ” স্যাংশন যাঁরা স্যাংশনের মতো জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং যাঁরা সেই আলোচনা শোনেন, তাঁদের উভয়েরই জানা প্রয়োজন যে আমেরিকার স্যাংশন কী, কিভাবে আরোপ করা হয় এবং এর প্রভাবই বা কতটুকু।
রাজনৈতিক হাতিয়ার জাতিসংঘ এবং আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক ক্ষমতাধর দেশ বিভিন্ন দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তার রোধের কাজ দেখিয়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও এই অস্ত্র যে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তা এখন অনেকের কাছেই পরিষ্কার। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপের এক বিশাল প্রক্রিয়া আছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ঘটনা বাদ দিলে এক বিশেষ প্রক্রিয়া এবং অনেক পদক্ষেপ অনুসরণ করেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এমনকি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে স্যাংশন আরোপ করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভুরিত এলেও তা অফিশিয়ালি জারি করতে বেশ সময় লেগেছে।
স্যাংশন জারি করে যে সংস্থা আমেরিকান স্যাংশন আরোপ করার একমাত্র ক্ষমতা রাখে ওফাক (OFAC — অফিস অব ফরেন অ্যাসেট কন্ট্রোল)। তারা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই কাজটি করে থাকে। ওফাক থেকে স্যাংশন জারি করে তালিকা প্রকাশ না করা পর্যন্ত কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়, এমনকি আমেরিকার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও জানতে পারবে না। আমরা যাঁরা ব্যাংকিং পেশায় কাজ করি, তাঁদের কাজের স্বার্থেই নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে সব সময় অবহিত থাকতে হয় এবং এ কারণে আমেরিকাভিত্তিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত পেশাদার সংস্থার সদস্যও হয়েছি। তার পরও আমাদের নতুন নতুন স্যাংশনের ব্যাপারে খোঁজখবর রাখতে, জানতে এবং এগুলো বুঝে কমক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।
স্যাংশন বেশ জটিল প্রক্রিয়া এ স্যাংশন কোনো সাধারণ বিষয় নয়। স্যাংশন খুবই উচ্চ মানের এক কমপ্লায়েন্স বিষয়, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যথেষ্ট আইনগত দিক। স্যাংশন নিয়ে কথা বলতে হলে এ বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে। উন্নত বিশ্বে আইনজীবী এবং সিজিএসএস বা সার্টিফায়েড গ্লোবাল স্যাংশন স্পেশালিস্ট ছাড়া অন্য কেউ এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করে না। অবশ্য ওফাক থেকে স্যাংশন জারি করে তালিকা প্রকাশ করলে তার ওপর সংবাদ প্রকাশ করা যেতেই পারে এবং সেখানে স্যাংশনের কার্যকারিতা বা ক্ষতিকর দিক নিয়ে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞের মন্তব্য দেওয়া যেতে পারে। এর বাইরে যদি ওফাক কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়, তাহলে হয়তো সংবাদ করা যেতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে সেই বক্তব্য অবশ্যই অফিশিয়াল মাধ্যমে পেতে হবে এবং ভেরিফাই করে নিতে হবে। তবে আমি নিশ্চিত যে ওফাক কর্তৃপক্ষের কেউ এ ব্যাপের কোনো যোগাযোগই করবেন না। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে সত্যি নতুন কিছু স্যাংশন আরোপ হতে পারে, তাহলে কি এভাবে ঢালাও আলোচনা করতে হবে। স্যাংশনের প্রভাব কতটুকু সেটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট, কিন্তু বিষয়টি কোনো দেশের জন্য অস্বস্তিকর তো বটেই। দেশের স্বার্থের পরিপন্থী বা অস্বস্তিকর কোনো বিষয় নিয়ে অপেশাদার আলোচনা কোনো অবস্থায়ই কাম্য হতে পারে না। বিশ্বের কোনো দেশেই সেটা হয় না। বেশ কয়েক বছর আগে আমাদের পার্শ্ববর্তী এক দেশের কোনো এক কম্পানির বিরুদ্ধে আমেরিকার স্যাংশন অমান্য করে ইরানের সঙ্গে লেনদেন করার অভিযোগ ওঠে এবং সে ব্যাপারে একটি অনুসন্ধানও হয়। অথচ বিষয়টি সে দেশের মানুষ আজও জানে না এবং আমাদের দেশের মানুষও সেভাবে জানে না ।
তিন ধরণের স্যাংশন এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমেরিকা যদি রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের ওপর নতুন কিছু স্যাংশন আরোপ করে, তাতে কি আদৌ বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ আছে? মোটেই না। ওফাক সাধারণত তিন ধরনের স্যাংশন আরোপ করে থাকে এবং এগুলো হচ্ছে–১. তালিকাভিত্তিক বা লিস্টবেসড স্যাংশন, ২. সেক্টরাল স্যাংশন এবং ৩. কম্প্রিহেনসিভ স্যাংশন।
তালিকাভিত্তিক বা লিস্টবেসড স্যাংশন: তালিকাভিত্তিক বা লিস্টবেসড স্যাংশন সাধারণত কোনো ব্যক্তিবিশেষের ওপর আরোপ করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশের র্যাবের সাবেক সাত সদস্যের ওপর যে স্যাংশন আরোপ করা হয়েছে, তা মূলত তালিকাভিত্তিক বা লিস্টবেসড স্যাংশন।
সেক্টরাল স্যাংশন: সেক্টরাল স্যাংশন সাধারণত কোনো বিশেষ খাত বা ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং গ্রুপের ওপর আরোপ করা হয়। বাংলাদেশ থেকে যদি শুটকি মাছ রপ্তানির ওপর স্যাংশন দেওয়া হয়, তখন তা হবে সেক্টরাল স্যাংশন।
কম্প্রিহেনসিভ স্যাংশন ঃ কম্প্রিহেনসিভ স্যাংশন আরোপ করা হয় সমগ্র দেশের ওপর এবং ধরনের স্যাংশন আসলেই মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে আমেরিকা সাধারণত এই সর্বোচ্চ স্যাংশন আরোপ করতে চায় না। কেননা এতে তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম না। পৃথিবীতে হাতে গোনা গুটিকয়েক দেশের ওপর এ ধরনের কম্প্রিহেনসিভ স্যারে আরোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে ইরান ও উত্তর কোরিয়া অন্যতম। এমনকি রাশিয়া-ইউ যুদ্ধের কারণে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করলেও আমেরিকা কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে কম্প্রিহেনসিভ স্যাংশন আরোপ করেনি। আমেরিকা কোনো দেশের ওপর তালিকাভিত্তিক বা লিস্টবেসড স্যাংশন দিয়ে এক ধরনের তারা এখন পর্যন্ত সেক্টরাল স্যাংশন আরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে থাকে।
স্যাংশনের প্রভাব স্যাংশন যত না ক্ষতিকর, তার চেয়ে বেশি আতঙ্কের। কম্প্রিহেনসিভ স্যাংশন বাদ দিলে অন্য দুটো স্যাংশনের খুব একটা প্রভাব নেই। এ রকম তালিকাভিত্তিক বা লিস্টবেসড এবং সেক্টরাল স্যাংশনের আওতায় বিশ্বের অনেক দেশের বিভিন্ন নাগরিক এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর স্যাংশন বলবৎ আছে এবং তাতে সে দেশের সঙ্গে আমেরিকার ব্যবসা-বাণিজ্যের তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। তার বড় উদাহরণ হচ্ছে চীন। কেননা তালিকাভিত্তিক বা লিস্টবে এবং সেক্টরাল স্যাংশনের আওতায় যেসব ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর স্যাংশন দেওয়া হবে, শুধু তাঁরাই আমেরিকা যেতে পারবেন না এবং আমেরিকার ডলারে লেনদেন করতে বা আমেরিকার পণ্যসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবেন না। অন্যান্য ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় না। স্যাংশন যেভাবে কাজ করে সে ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে আর এ বিষয় নিয়ে বেশি আলোচনার প্রয়োজন পড়ে না।
বাংলাদেশে কতটা প্রযোজ্য হতে পারে বর্তমানে বাংলাদেশ যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে এবং আমেরিকার যে অবস্থা, তাতে এই মুহূর্তে নতুন করে স্যাংশন আরোপের কোনো অবস্থা আছে বলে মনে হয় না। আমেরিকা নিজেই এখন মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়ে এক ধরনের চাপের মধ্যে আছে। তা ছাড়া আমেরিকা তাদের এই অর্থনৈতিক অস্ত্র, স্যাংশন নির্বিচারে ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী বিরূপ সমালোচনার মধ্যে আছে এবং তারা কারণে-অকারণে স্যাংশন ব্যবহার করে এই অস্ত্র ভোঁতা করে ফেলেছে। তাদের এই অস্ত্র যে এখন আর সেভাবে কাজ করে না, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। তাই বিষয়টি নিয়ে বিচলিত হওয়ার বা বিশদ আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
যেভাবে স্যাংশন মোকাবেলা করতে হবে এ কথা সত্য যে এই মুহূর্তে বিশ্বরাজনীতি ক্রমেই যেভাবে জটিল হয়ে উঠছে তাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে চাপে ফেলে পক্ষে টানার প্রচেষ্টা যে করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে তালিকাভিত্তিক বা লিস্টবেসড স্যংশনের কিছুটা প্রয়োগ হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে যদি তেমনটা হয়, তবে তা মোকাবেলা করতে হবে কূটনৈতিকভাবে এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে। এ জন্য বিচলিত না হয়ে যথেষ্ট সময় নিয়ে আলোচনা করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ আমেরিকার বন্ধু দেশ। তাই বাংলাদেশের বৃহৎ ক্ষতি হবে–এমন সিদ্ধান্ত আমেরিকা নেবে না। তবে ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেহেতু বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই আমেরিকার সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সব সময় সমানভাবে আমাদের পক্ষে না- ও আসতে পারে। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণে আমাদের দেশের গুরুত্বের বিষয়টিকে কৌশলে কাজে লাগাতে পারলে ভিসানীতি বা স্যাংশন কোনো সমস্যা হবে না।
০১ অক্টোবর, ২০২৩। নিরঞ্জন রায়। লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা। সূত্র: কালেরকণ্ঠ।