ভূমিকা দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলো আছে, সেখানে পৃথিবীর বৃহৎ একটা জনসংখ্যা বাস করে, বিশেষ করে ভারত একাই একটা বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। তাদের বিশাল একটা অর্থনীতি রয়েছে। বাংলাদেশও জনসংখ্যার দিক দিয়ে মোটামুটি বড় একটা দেশ–এখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও আছে। এই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বাণিজ্য প্রসার–এসব নিয়ে বহুদিন থেকেই কথাবার্তা হচ্ছে। এবং নানা রকম প্রচেষ্টাও নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় অতি সম্প্রতি ১৪তম দক্ষিণ এশিয়া ইকোনমিক সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বেশ খোলামেলা আলোচনা হয়েছে এবং সে আলোচনা বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।..
আন্তর্জাতিক মুদ্রা এখানে অভিন্ন মুদ্রা মানে কমন কারেন্সি নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। অভিন্ন মুদ্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ বাণিজ্য প্রসারের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা খুব বেশি দরকার। ‘বিশ্বব্যাপী ডলারের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। ডলার দিয়ে বেশি লেনদেন হয়। এরপর ইউরো আছে, স্টার্লিং দিয়ে কিছু হয়, কিছু ইয়েন আছে। অন্যান্য মুদ্রা দিয়ে তেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হয় না। সেগুলো রিজার্ভ মুদ্রাও নয়। রিজার্ভ মুদ্রা বলতে ডলার, ইউরো, স্টার্লিং, ইয়েন ও ইউয়ান। এই পাঁচটি দিয়ে মোটামুটি ট্রানজেকশন করা হয়। এবং কিছু সময়ে অস্ট্রেলিয়ান ডলার এবং কানাডিয়ান ডলার ব্যবহার করা হয়।
অভিন্ন মুদ্রা নিয়ে সম্মেলনে আলোচনা ” দক্ষিণ এশিয়ায় অভিন্ন মুদ্রার জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার এই পরিপ্রেক্ষিতে এখন দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অভিন্ন মুদ্রার কথা বলা হচ্ছে। তার মানে হলো এসব মুদ্রার বাইরে অভিন্ন একটি মুদ্রার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্য হয়েছে। এখানে বাণিজ্য প্রসারের ব্যাপারে তো বিমসটেক (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর প্রসার হয়। এখন প্রথমে দেখা যায় যে এখানে বাণিজ্য প্রসার সম্পর্কে কী কী উদ্যোগ নেওয়া মাল্টিসেক্টরাল, টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন), সংযোগের জন্য বিবিআইএন (বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল সংযুক্তি) আছে, সার্কও (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা আছে। সার্ক হলো সামিট পর্যায়ের, সেখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে সহযোগিতার কথাবার্তা হয়। এখানে কিন্তু বেশির ভাগ এখনো ডলার, আমি যে হার্ড কারেন্সি বললাম, সে হার্ড কারেন্সি নিয়ে হয়। তবে সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পন্ন করার জন্য ভারতীয় রুপির ব্যবহারে চুক্তি হয়েছে। চীনের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে চীনা মুদ্রায় বাণিজ্য করা হবে; এগুলো সীমিত। বিশেষ করে ভারত আর বাংলাদেশের বাণিজ্য অনেক বেশি। সেখানে ভারতের কপিটা প্রাধান্য পাবে। রুপি এবং টাকা দিয়ে বাণিজ্য করা। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের তো ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য আছেই। বাংলাদেশের যেটা হয় বহির্বাণিজ্য, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য; সেটার ক্ষেত্রে মাত্র একটা অংশ ভারতের সঙ্গে। বাকি অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য আছে।
অভিন্ন মুদ্রা আসলে কতটুকু যৌক্তিক অতএব এখন অভিন্ন মুদ্রার কথা উঠছে। এটা অনেক সময় অনেকে ভাবতে পারে, অভিন্ন মুদ্রা আসলে যৌক্তিক। না হলে দক্ষিণ এশিয়া বেশিদূর এগোতে পারবে না। তবে এখানে কতগুলো বিশেষ বিবেচনার বিষয় আছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে অভিন্ন মুদ্রা করা কিন্তু খুব একটা সহজ হবে না। এখন ডলারের প্রভাব একটু কমছে। তবু পৃথিবীর বেশির ভাগ বাণিজ্য ডলারে হয়–প্রায় ৯০-৯১ শতাংশ ডলারে হয়। এখন কিছুটা কমে হয়তো ৮৪-৮৫ শতাংশ হয়। তলার বাজারে বিভিন্ন দেশে মাঝে মাঝে অস্থিরতা হয়। এই অস্থিরতা নিয়ে নানাজন নানাভাবে প্রচারণা করছে। এই প্রচারণার মূল বিষয়বস্তু কিন্তু অনেকটা রাজনৈতিক। যেমন- রাশিয়া, চীন ও ভারত ডলারের আধিপত্য কমাতে চাইছে। তারা চেষ্টা করছে তাদের মতো করে। সুইফটকে রিপ্লেস করার চেষ্টা হচ্ছে, একইভাবে ডলারকে। কিন্তু রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলারের এখনো প্রাধান্য আছে। এটা হয়তো রিপ্লেস করা সম্ভব হবে। কিন্তু শিগগিরই সেটা করা সম্ভব হবে না।
চীনের আধিপত্যে আরেকটা পরিপ্রেক্ষিত হলো, সম্প্রতি চীন একটা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ করেছে। সেখানে চীনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশ যুক্ত হয়েছে। সেখানে বাণিজ্য হবে- সেটা বড় একটা ইস্যু তা ছাড়া এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এআইডিবি) করেছে। অনেক বড় একটা ব্যাংক। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এআইডিবি করা হয়েছে। এই এআইডিবি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এডিবি–এদের রিপ্লেস করতে চেষ্টা করবে। কারণ চীনের প্রচুর অর্থ আছে। চীন এটার মূল হোতা, বাংলাদেশ এটার সদস্য।
বাংলাদেশের জন্য ডি-ডলারাইজেশন কঠিন হবেঃ এই পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে হয় যে, চট করে বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য ডি-ডলারাইজেশন তথা ডলার থেকে বেরিয়ে এসে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য শুরু করা কঠিন হবে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য যথেষ্ট নয়। আমার তো বাইরে যেতে হবে। আমাদের রপ্তানির বড় একটা অংশ তো যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক অনেক দেশে রপ্তানি হয়। তৈরি পোশাক শিল্পে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা তো চট করে অন্য মুদ্রায় শিফট নাও করতে পারে। ভারত হয়তো করতে পারে। কারণ আঞ্চলিক একটা সুবিধা পেতে পারে। অন্য দেশ অভিন্ন মুদ্রা চালু করতে আরো সময় নেবে। অতএব এই পরিপ্রেক্ষিতে এটা কিন্তু এত সহজ হবে না। আরেকটা জিনিস বলে রাখা ভালো, এটা করতে হলে যেটা প্রয়োজন হবে, একটা রাজনৈতিক সমঝোতা হতে হবে। কারণ আমরা দেখেছি যে সার্কের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন রাস্তাঘাট শিক্ষাপ্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। অতএব রাজনৈতিক সমঝোতা যদি না হয়, আমরা অর্থনীতিবিদরা বা ব্যবসায়ার বলি না কেন–এটা করতে হবে, এটা ভালো হবে, তা কিন্তু সম্ভব হবে না। এ রকম আপনি সহযোগিতা, আঞ্চলিক মুদ্রায় লেনদেন আসিয়ান দেশগুলো, সাউথ আফ্রিকান দেশগুলো করে। ওরাও এখনো ডলার থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি ।
আকুর বাণিজ্য যেভাবে হয়/আকুতে অভিন্ন মুদ্রার সম্ভাবনা
আকুর গঠন: আরেকটি জিনিস আমি বিশেষভাবে বলতে চাই। এখানে এশিয়ান ক্লিয়ারি ইউনিয়ন বলে একটি সংস্থা আছে–১৯৭৪ সালে এটি গঠিত হয় এসকাপের আওতায়। সেখানে ৯টি দেশ–বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা আছে। আকুর মাধ্যমে বাণিজ্যগুলোর পেমেন্ট যেটি হয়–৯টি দেশে। আর ভারত সবচেয়ে বড় একটি দেশ–বিশাল বাণিজ্যের দেশ।
আকুর হিসাব নিষ্পত্তি: আকুর মাধ্যমে সেই দেশ সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়ে থাকে। আমাদের বাণিজ্যের পেমেন্টগুলো সেটল করা হয় দুই মাস অন্তর অন্তর। সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক দুই মাস পর পর হিসাব করে। বাংলাদেশ সব সময় নেট পেয়ার, মানে বাংলাদেশকে দিতে হয়। আর ভারত সব সময় নেট রিসিভার, মানে তারা টাকা পায়। তারা দুই মাস পর পর অন্যান্য দেশ থেকে টাকা পায় । কারণ ভারত সবচেয়ে বড় এক্সপোর্টার অন্যান্য দেশের তুলনায়।
আকুর মানিটরি ইউনিট/ম্যাকানিজম: এই পরিপ্রেক্ষিতে আকুর একটি মানিটরি ইউনিট আছে। এটিকে এশিয়ান মানিটরি ইউনিট বলে । অর্থাৎ আকু ইউনিট বলে । সেখানে তিনটি মুদ্রা গ্রহণ করা হয়। ডলার, ইউরো ও ইয়েন। এই তিনটিতে আকুর সেটলমেন্টটি হয়। অনেক সময় সেটিকে বলে আকু ডলার, আকু ইউরো ও আকু ইয়েন। এখন কিন্তু তিনটি কারেন্সি অলরেডি যোগ করে একটি একক মুদ্রা অভিন্ন মুদ্রা করেছে। এবং সবচেয়ে বিশেষ জিনিস হলো, ওখানে কিন্তু একটি ইউএস ডলার, আকু ডলার মানে এক ইউএস ডলার, মানে এক ইউরো, এক জাপানিজ ইয়েন। এটি হিসাব সুবিধার জন্য করা হয়েছে। মোটামুটি মেকানিজমটি কাজ করছে। বাণিজ্যে তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। ইরানের ওপর একটি মার্কিন স্যাংশন আছে। তবু বাণিজ্যের ব্যাপারে তেমন কোনো অসুবিধা হয় না। অতএব হয়তো বা অভিন্ন কারেন্সি হলে আকুতেও অভিন্ন কারেন্সি গ্রহণ করতে হবে ।
আকুতে রুপির যৌক্তিকতা তবে এ প্রসঙ্গে আমি একটু বলি, ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম, তখন আমি আকুর চেয়ারম্যান ছিলাম দুই বছর। ৯টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বা দেশের মনিটর অথরিটির প্রধান এটির সদস্য। সেখানে একবার একটি প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল যে আকুতে ভারতীয় রুপি যুক্ত করা যায় কি না। প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল ঢাকায়, ফরমাল মিটিংয়ে। এটি কিন্তু আকুর ৯ দেশ অনেক চিন্তা-ভাবনা করে, অনেক পর্যালোচনা করে বলেছে, এটি সম্ভব নয়। তখনই কিন্তু বলা হয়েছে, যদি রেগুলেটার, আঞ্চলিক সহযোগিতার শীর্ষ পর্যায়ের সমঝোতা, তারপর মনিটর কিভাবে করবে, কিভাবে রাখবে, সেগুলো যদি ঠিকভাবে না করা হয়, তাহলে কমন কারেন্সি করা যুক্তিসংগত হবে না ।
আরেকটু পর্যবেক্ষণ দরকার আকুর সব সেটলমেন্ট প্রসেস, হিসাবায়ন পদ্ধতি– এগুলো জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন এসকাপের সহযোগিতায় হয়েছে। এখন পরিপ্রেক্ষিত পরিবর্তন হয়েছে। এখন আবার বেটার ইস্যু হবে, চট করে অভিন্ন মুদ্রায় চলে যাব, এটা ভালো হবে না। অনেক আলোচনা চলছে বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে। বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে মূল হলো আঞ্চলিক সমঝোতায় সেখানে পণ্য সেবা বাড়বে, মানুষ অবাধে চলাচল করবে, যোগাযোগব্যবস্থা হবে। সেখানে মুদ্রাটা একটা মাধ্যম মাত্র। এটা অভিন্ন হয়ে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়বে- এমনটা হবে না, তবে দু-একটা দেশ প্রাধান্য পাবে। আর বাকিগুলো পিছিয়ে পড়বে। সব পরিপ্রেক্ষিতে একটু বিচার-বিবেচনা করে আরেকটু পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
উপসংহার এখানে শুধু আর্থিক বিবেচনায় নয়, এখানে রাজনৈতিক বিবেচনা আছে, আঞ্চলিক বিবেচনা আছে। এখানে অন্যান্য সহযোগিতার যে ক্ষেত্রগুলো আছে, সেগুলো বিবেচনা করে এটা করতে হবে। এর আগে এটা নিয়ে একবারে ঝাঁপিয়ে পড়া ঠিক হবে না।
১১ নভেম্বর, ২০২৩। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র: কালেরকণ্ঠ।